(Vincent van Gogh)
আমিই সেই ভিনসেন্ট উইলেম ভ্যান গঘ। যাঁকে নিয়ে আজ পৃথিবীতে সবার এত কৌতূহল।
আজ আমার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ বিস্ময় প্রকাশ করে, আমার ছবিতে আলোর ব্যবহারকে যুক্তি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে, এমনকি আমার ছবির রঙের মধ্যে লোকে ঈশ্বরকেও খোঁজে। আমারই ছবি ঘিরে কত লোক কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছে। অথচ কেউ হয়তো জানেই না অন্ধকার আমায় জীবনে কী দিয়েছে আর কেনই বা আমি বারে বারে আলোয় ফিরতে চেয়েছি। কেউ কখনও এও জানতে চায়নি আমার চোখে রাতের আকাশ এত নীল কেন? কেন সূর্যমুখীরা আমার মনে বিষণ্ণতা ডেকে আনত, কিংবা শুকনো সূর্যমুখীতে আমি কীসের সৌন্দর্য খুঁজে পেয়েছিলাম। কেউ কি সত্যিই জানে আমার চোখে গমের ক্ষেতের পথ কেন কখনও শেষ হয়নি!
আরও পড়ুন: মনুষ্য বিকল্প: AI কি ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী?
আমার কান কেটে ফেলার গল্প হয়তো সবাই জানে, কিন্তু তার ভিতরের নিঃসঙ্গতার কথা কেউ শোনেনি। আমার আত্মহত্যা? সে তো সবাই পড়েছে, কিন্তু মৃত্যুর আগেও একজন মানুষ যে কতবার মরে যেতে পারে, সে হিসেব কি কেউ রেখেছে!
আসলে আমি যে কখনও লোককে দেখানোর জন্য ছবি আঁকিনি, আমি আঁকতাম নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, নিজের মনের অস্থিরতাকে দূর করার জন্য। তাই আমার ছবিগুলো অন্যরকম। আমার ছবি অন্যরকম, কারণ পৃথিবীকে তো আমি কখনও চোখ দিয়ে দেখিনি, আমি অনুভব করেছি মনের অস্থিরতা দিয়ে। পৃথিবী বোধহয় আজও ভীষণ অস্থির, তাই লোকে আমার ছবির এত কদর করে।
আমার জন্ম ১৮৫৩ সালের মার্চ মাসে, নেদারল্যান্ডসের ছোট্ট গ্রাম গ্রুট-জুন্ডার্টে। মৃত্যুর সঙ্গে আমার পরিচয় জ্ঞান হওয়ার পরপরই। আমার জন্মের ঠিক এক বছর আগে আমার মা এক মৃত পুত্র সন্তান প্রসব করেছিলেন, যার নাম দিয়েছিলেন ভিনসেন্ট। আমাদের গির্জা যাওয়ার পথের পাশেই ছিল সেই ভিনসেন্টের সমাধি। প্রতি রবিবার গির্জায় যাওয়ার সময় ভিনসেন্টের সমাধিফলক আমাকে আমার মৃত্যুর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিত। তখন বুঝিনি, মৃত ভিনসেন্টের ওই সমাধিফলক আমার জীবনে কী সাংঘাতিক বিষণ্ণতার ছাপ ফেলেছে।
আমাদের পরিবার ছিল অত্যন্ত ধর্মভীরু। বাবা ছিলেন পাদ্রি। বাড়ি ভর্তি ছিল ধর্মগ্রন্থ আর বাইবেল। অধিকাংশ সময় বাড়িতে ঈশ্বরের প্রার্থনা আর ঈশ্বরের অসীম কৃপার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হত, যা আমি মানতে পারতাম না। আমার মনে হত, ঈশ্বর গির্জার ভিতরে কেন থাকেন, ঈশ্বর কেন মাঠে কাজ করা কৃষকের ঘামে, ক্ষুধার্ত শ্রমিকের ঘরে বা প্রচণ্ড শীতে কাঁপতে কাঁপতে পাতাঝরা গাছের ডালে থাকেন না। এইসব আমাকে ভাবাত। কারণ আমি যে আর পাঁচটা ছেলের মতো ছিলাম না। ওই বয়সে খেলাধুলোর চেয়ে আমার মাঠে হাঁটতে বেশি ভাল লাগত। কুয়াশাঢাকা সকাল, আকাশের উড়ে যাওয়া মেঘ, শান্ত গাছের ছায়া, এসব আমাকে অদ্ভুতভাবে টানত। আমার মা ছবি আঁকতেন, ছোট ছোট ফুল আর নানা রঙের শুকনো পাতার ছবি। অবাক হতাম এত রঙের শুকনো পাতা দেখে। মা বলতেন মৃত্যুরও রঙ আছে। হয়তো তাঁর থেকেই প্রথম আমার মনে রঙের ভাষা তৈরি হয়েছিল।
প্রথমে হেগ, তারপর লন্ডন, শেষে প্যারিস। গুপিলেই প্রথমবার দেখলাম, শিল্পও বাজারে বিক্রি হয়। ধনী লোকেরা দর কষাকষি করে ছবি কেনে। আমার কাছে শিল্প ছিল আত্মার মতো, সেই আত্মাকে বিক্রি হতে দেখে অবাক হয়েছিলাম।
নিঃসঙ্গতাকে আমি প্রথম চিনি ছোটবেলায়, যখন আমাকে বোর্ডিং স্কুলে পাঠানো হয়। বাড়ি থেকে দূরে, অচেনা একটা ঘরে শুয়ে শুয়ে আমি জানলার বাইরে আকাশ দেখতাম আর মনে হত, পৃথিবীতে আমি বোধহয় কোনও ভুল জায়গায় এসে পড়েছি। তখন বই-ই ছিল আমার একমাত্র আশ্রয়। বাইবেল, চার্লস ডিকেন্স, ভিক্টর হুগো, এমিল জোলা, বালজাকের সঙ্গে শেক্সপিয়রের লেখা পড়তাম। বাইবেল ছাড়া সবার লেখাই আমাকে সেইসময় সমাজকে জানতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। বিশেষ করে জঁ-ফ্রাঁসোয়া মিলে। ওঁর কাজ আমায় ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল। জঁ-ফ্রাঁসোয়া মিলের কাজ থেকেই আমি প্রথম শ্রমিক কৃষকের জীবনযাত্রা নিয়ে ছবি আঁকার ব্যাপারে অনুপ্রেরণা পাই। গরিব মানুষ, কৃষক-শ্রমিকের জীবন তাদের দুঃখকষ্টের কথা আমায় সাংঘাতিক প্রভাবিত করত। সেই সময়ই আমি প্রথম অনুভব করি, মানুষের দুঃখ, কষ্ট, ভয় বা ঘৃণারও রঙ আছে।
আমার বয়স যখন ষোলো, আমাকে পাঠানো হল হেগ-এ গুপিল অ্যান্ড কোম্পানিতে কাজ করতে। গুপিল অ্যান্ড কোম্পানি ছিল সেই সময়ে ইউরোপের অন্যতম বড় আর্ট ডিলার। আমি সেখানে মূলত একজন আর্ট সেলসম্যানের সহকারী হিসেবে কাজ করতে শুরু করি। কোম্পানির শাখা ছিল হেগ, লন্ডন, প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে। আমার কাকা সেন্ট, তাঁর সুপারিশেই এখানে আমার চাকরি হয়।

প্রথমে হেগ, তারপর লন্ডন, শেষে প্যারিস। গুপিলেই প্রথমবার দেখলাম, শিল্পও বাজারে বিক্রি হয়। ধনী লোকেরা দর কষাকষি করে ছবি কেনে। আমার কাছে শিল্প ছিল আত্মার মতো, সেই আত্মাকে বিক্রি হতে দেখে অবাক হয়েছিলাম।
এরপরে আসি লন্ডনে। লন্ডনে থাকাকালীনই আমি প্রথম প্রেমে পড়ি। উরসুলা, আমার বাড়িওয়ালির মেয়ে। ওকে দেখলেই আমার বুক কেঁপে উঠত। একদিন সাহস করে ওকে আমার মনের কথা বলতে ও হেসে ফেলল! জানাল, ও অন্য কাউকে ভালবাসে। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, আকাশটা আমার মাথায় ভেঙে পড়ল। আমি যে উরসুলাকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছিলাম, ওকে আর বলে উঠতে পারলাম না। আজ বুঝতে পারছি প্রত্যাখ্যান তখন থেকেই আমার জীবনের ছায়াসঙ্গী হয়ে গিয়েছিল। সেই থেকে হতাশা আমাকে আঁকড়ে ধরল। সেই ঘটনার পর থেকেই আমি ধীরে ধীরে কেমন বদলে যেতে লাগলাম। কাজে মন বসত না। মন শক্ত করার জন্য বাইবেল পড়তাম, ঈশ্বরকে নিয়ে পাগলের মতো নানা কথা ভাবতাম। শেষ পর্যন্ত চাকরিটাও চলে গেল।
তখন আমার ভীষণ অর্থকষ্ট। পাশে পেলাম থিওডোরকে। আমারই ছোট ভাই, আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। থিও আমাকে চিঠি লিখত, টাকাও পাঠাত। থিও ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা।
ভাবলাম, শিল্প নয়, ঈশ্বরই আমার পথ। ধর্মযাজক হতে চাইলাম। কিন্তু পরীক্ষায় উতরাতে পারলাম না। চার্চের পাদ্রিরা আমায় ধর্মযাজক পদে অযোগ্য ঠাওরালেও ওঁরাই আবার আমায় বেলজিয়ামের বোরিনাজ কয়লাখনি অঞ্চলে একটা ধর্মপ্রচারকের কাজ দিল। সেই প্রথম কাছ থেকে মানুষের প্রকৃত যন্ত্রণার রূপ দেখলাম। অন্ধকার খনির ভিতরে শ্রমিকেরা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে, শ্বাসের কষ্ট নিয়ে, পেটে খিদে নিয়ে, প্রচন্ড কালো ধুলোর মধ্যে মালিকের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। সবসময় তাদের কষ্টে ভরা শুকনো মুখগুলো আমার চোখের সামনে ভাসত। আমি তাদের সঙ্গেই থাকতে শুরু করলাম। নিজের জামাকাপড়, বিছানা, খাবার, সব বিলিয়ে দিলাম। একদিন হঠাৎ খনিতে কীসের একটা বিস্ফোরণে বেশ কয়েকজন আহত হল। অবাক হলাম দেখে ওদের সাহায্য করতে কেউ এগিয়ে এল না। ওরা নিজেরাই নিজেদের পাশে দাঁড়াল। ওদের রক্তাক্ত শরীর দেখে বারবার ভাবছিলাম ঈশ্বর কেন নেই এদের পাশে!
একসময় চার্চও আমাকে বরখাস্ত করল। তারা বলল, আমি নাকি পাগলের মতো আচরণ করছি। এখন বুঝতে পারি, সেদিনই আমার ভিতরে শিল্পীসত্তার জন্ম হয়েছিল। শুরু হল আমার শিল্পী জীবন। কয়লা দিয়ে স্কেচ করা শুরু করলাম। শুধুই ক্লান্ত শ্রমিকদের মুখ, কৃষকদের ঘামে ভেজা শরীর, জীর্ণ পোশাক, এইসবই ছিল আমার ছবির বিষয়বস্তু। আমি জীবনকে বাদ দিয়ে জোর করে সৌন্দর্যকে আঁকতে পারতাম না। অদ্ভুত ছিলাম! আমার চোখে একটা পুরনো জামার মধ্যেও মানুষের জীবন ধরা পড়ত।
তখন আমার ভীষণ অর্থকষ্ট। পাশে পেলাম থিওডোরকে। আমারই ছোট ভাই, আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। থিও আমাকে চিঠি লিখত, টাকাও পাঠাত। থিও ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা। আমি যখন না খেয়ে দিন কাটিয়েছি, তখনও থিও লিখেছে— ‘আঁকা ছেড়ো না ভিনসেন্ট, আঁকতে থাকো।’ আমাদের সেই চিঠিগুলোই আমার আসল আত্মজীবনী।
একসময় হেগ-এ আমি সিয়েন হুর্নিক নামে এক পতিতার সঙ্গে থাকতাম। সিয়েন তখন গর্ভবতী। প্রথমে সে ছিল আমার মডেল, পরে আমরা একসঙ্গে থাকতে শুরু করি। সিয়েনকে আমি বিয়ে করতে চেয়েছিলাম। বলেছিলাম, ওর গর্ভের সন্তানেরও আমি দায়িত্ব নেব। কিন্তু সমাজ বেঁকে বসল, আমাকে ঘৃণার চোখে দেখল, আমার পরিবারও মুখ ফিরিয়ে নিল। আমি কিন্তু সিয়েনের ক্লান্ত মুখে মানুষের জীবনের আসল সত্যটা দেখতে পেয়েছিলাম। সিয়েন প্রাচুর্য চেয়েছিল, আমি সত্যিটা দেখতে চেয়েছিলাম। সেই সম্পর্কও ভেঙে গেল।
থিও’র বাড়ি ছিল প্যারিসের উত্তরে মনমার্ত্রের লেপিক রোডে। থিও’র কাজের সূত্রেই আমি ধীরে ধীরে প্যারিসের শিল্পী সমাজ, ইমপ্রেশনিস্ট আন্দোলন আর তাদের নতুন শিল্পধারার সঙ্গে পরিচিত হতে থাকি।
তারপর নুয়েনেনে এলাম কৃষকদের নিয়ে কাজ করতে। আমি পৃথিবীকে তাদের কষ্ট দেখাতে চেষ্টা করলাম। আঁকলাম The Potato Eaters। সবাই বলল, কুৎসিত ছবি। আমি বললাম, ‘আমি তো শুধু বলেছি ওরা যে হাতে মাটি খোঁড়ে, সেই হাতেই খায়। সেটাই তো সত্যি!’ আমি কখনও বাইরের নিখুঁত সৌন্দর্যে বিশ্বাস করিনি। আমি শুধু কষ্টের মধ্যে সৌন্দর্য খুঁজেছি।
এইভাবে আর চলছিল না। থিও’র পরামর্শে ১৮৮৬ সালে আমার শিল্পীসত্তাকে গড়তে প্যারিসে এসে উঠলাম। থিও তখন প্যারিসে আর্ট ডিলার গুপিলে কাজ করত। থিও ছিল গুপিলের প্যারিস শাখার আর্ট ডিলার। সেই সুবাদে থিও’র সঙ্গে সেই সময়কার আধুনিক ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের ভাল পরিচয়ও ছিল।
থিও’র বাড়ি ছিল প্যারিসের উত্তরে মনমার্ত্রের লেপিক রোডে। থিও’র কাজের সূত্রেই আমি ধীরে ধীরে প্যারিসের শিল্পী সমাজ, ইমপ্রেশনিস্ট আন্দোলন আর তাদের নতুন শিল্পধারার সঙ্গে পরিচিত হতে থাকি।
প্যারিস আমার সামনে নতুন এক পৃথিবী তুলে ধরল। এতদিন আমি যে পৃথিবীকে চিনতাম, তা ছিল মাটির রঙের, ধূসর আকাশের, কয়লার ধোঁয়ায় ঢেকে থাকা মানুষের জীবন। এতদিন আমি ছেলেবেলার গ্রুট-জুন্ডার্টের সেই অন্ধকার ঘর, বোরিনাজে খনি-শ্রমিকের মুখ, নুয়েনেনের ক্লান্ত কৃষকের শরীর, এসব নিয়েই ছবি এঁকেছি। আমার রঙ ছিল ভারী, গাঢ়, বিষণ্ণ। কিন্তু প্যারিসে এসে বুঝলাম, আলোও রঙের একটা ভাষা। রঙেরও শ্বাস-প্রশ্বাস আছে।
প্যারিসে এসে আমি জাপানি উকিয়ো বা উড ব্লকপ্রিন্ট দেখে, সেই প্রিন্টের প্রেমে পড়ে গেলাম। বিশেষ করে উতাগাওয়া হিরোশিগে আর কাতসুশিকা হোকুসাই-এর কাজ আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিল।
থিও’র বাড়ির কাছে মন্টমার্ত্রের সাক্রে-ক্যর ব্যাসিলিকার সামনের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমি প্রথম ইমপ্রেশনিস্টদের ছবি দেখি। ক্লদ মোনের ছবিতে সূর্যের আলো যেন জলের উপর কেঁপে উঠছে। কামিল পিসারোর ছবি দেখে শিখলাম, প্রকৃতির রঙ কখনও স্থির থাকে না। একই গাছ সকাল, বিকেল আর সন্ধ্যার রঙে আলাদা আলাদা রূপ নেয়। আর এডগার দেগা’র ছবিতে আমি দেখলাম মুহূর্তকে ধরে রাখার এক অদ্ভুত ক্ষমতা। বুঝতে পারলাম এতদিন আমি অন্ধকারের মধ্যে ছিলাম। প্যারিসে এসে প্রথম সত্যিকারের আলো দেখতে পেলাম।
থিও’র অ্যাপার্টমেন্টের ঘরটাই তখন আমার স্টুডিও, রঙ নিয়ে খেলার জায়গা। প্রতিদিন নতুন শিল্পীদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, নতুন ছবি দেখছি, নতুন চিন্তাভাবনার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি। আগে যেখানে আমি কালচে বাদামি আর ধূসর রঙে মজে থাকতাম, সেখানে এখন আমার ক্যানভাসে উজ্জ্বল হলুদ, গভীর নীল, চোখ জুড়ানো সবুজ আর আগুনের মতো কমলা রঙ খেলে বেড়াতে শুরু করল। আমি বুঝতে পারলাম, মানুষের দুঃখকষ্ট দেখানোর জন্য শুধু অন্ধকার নয়, আলোরও প্রয়োজন আছে। অন্ধকারেরও রঙ হয়।

প্যারিসে এসে আমি জাপানি উকিয়ো বা উড ব্লকপ্রিন্ট দেখে, সেই প্রিন্টের প্রেমে পড়ে গেলাম। বিশেষ করে উতাগাওয়া হিরোশিগে আর কাতসুশিকা হোকুসাই-এর কাজ আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিল। কী নেই তাতে, প্রকৃতির নানা ঋতু, সমুদ্রের ঢেউ, পাহাড়, সঙ্গে শহরের আর গ্রামের দৈনন্দিন জীবন। এইসব ছবিতে কোনও কৃত্রিম জটিলতা নেই, আছে নিস্তব্ধতা, স্বচ্ছতা আর প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার এক আশ্চর্য উপস্থাপনা। আমি নিজের ঘরের দেওয়ালে সেইসব প্রিন্টগুলো টাঙিয়ে রাখতাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। মনে হত, জাপানি শিল্পীরা সত্যিই প্রকৃতির নিঃশ্বাস শুনতে পায়। তারা গাছ আঁকে না, কিন্তু গাছের আত্মাকে আঁকে।
এইসব দেখে আমি তখন নিজের ছবিকেও আরও সরল, আর উজ্জ্বল করার চেষ্টা করছি। আমার ব্রাশের টান বদলে যাচ্ছে। ছোট ছোট দ্রুত আঁচড়ে আমি আলোকে ধরতে চাইছি। রঙকে মিশিয়ে আর নিস্তেজ না করে তাদের ক্যানভাসের উপর পাশাপাশি বসিয়ে দিচ্ছি, যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে পারে। আমি বরাবরই অনুভব করতাম, শিল্প কেবল বাস্তবকে নকল করা নয়— শিল্প হল নিজের ভিতরের অনুভূতিকে রঙের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া।
আর্লে এসে প্লাস লামার্তিনে আমি একটা ছোট্ট হলুদ রঙের বাড়ি ভাড়া নিলাম। সেই বাড়িটাই পরে ‘ইয়েলো হাউস’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। বাড়িটা বাইরে থেকে খুব সাধারণ ছিল।
সেই সময় প্যারিস আমাকে শুধু নতুন রঙই দেয়নি, নতুন চোখও দিয়েছিল। এখানে এসে আমি বুঝেছিলাম, পৃথিবীকে শুধু চোখে দেখলেই হয় না, তাকে অনুভব করতে হয়। আর সেই অনুভূতির ভাষাই ধীরে ধীরে আমার ছবিকে বদলে দিতে শুরু করল।
এতসবের পরেও প্যারিসের কোলাহল আমাকে ক্রমশই অস্থির করে তুলছিল। কীরকম ক্লান্ত লাগত। প্যারিসের কোলাহল, ধোঁয়া আর ক্লান্তি থেকে দূরে আমি এমন এক জায়গায় যেতে চাইছিলাম, যেখানে অফুরন্ত আলো থাকবে আর আমি শুধু রঙ আর ছবি নিয়েই বাঁচতে পারব। এইসব ভেবে ঠিক করলাম, আমি দক্ষিণ ফ্রান্সের আর্ল শহরে চলে যাব। সেই বছরই মানে ১৮৮৮ সালে আমি আর্ল শহরে এসে পৌঁছালাম। দক্ষিণ ফ্রান্সের আলো আমাকে পাগল করে তুলল। যেন বহুদিনের এক স্বপ্নের খোঁজ পেলাম।
আর্লে এসে প্লাস লামার্তিনে আমি একটা ছোট্ট হলুদ রঙের বাড়ি ভাড়া নিলাম। সেই বাড়িটাই পরে ‘ইয়েলো হাউস’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। বাড়িটা বাইরে থেকে খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু আমার কাছে সেটা শুধু একটা বাড়ি ছিল না, ছিল একটা স্বপ্ন। আমি ভাবতাম, এখানে একদিন শিল্পীদের একটা পরিবার গড়ে উঠবে। সবাই একসঙ্গে থাকবে, একসঙ্গে ছবি আঁকবে আর তাদের মধ্যে থেকে নতুন ধরনের শিল্পের জন্ম হবে। আমি সেই বাড়ির প্রতিটা দেয়াল, প্রতিটা ঘর নিজের হাতে সাজাতে শুরু করলাম। কাঠের সাধারণ চেয়ার, ছোট্ট বিছানা, কয়েকটা ছবি, আর চারদিকে উজ্জ্বল রঙ— এসব দিয়েই আমি আমার কল্পনার আশ্রয় তৈরি করেছিলাম।
আর্লের সূর্যের আলো সেই বাড়ির হলুদ দেওয়ালে পড়ে আগুনের মতো জ্বলে উঠত। সেই আলো আমাকে উন্মত্তের মতো কাজ করতে বাধ্য করত। দিনের পর দিন আমি বাইরে মাঠে, গমের ক্ষেতে, নদীর ধারে ছবি এঁকেছি। আর রাতে ফিরে এসে সেই হলুদ বাড়ির ভিতরে বসে আবার ক্যানভাসে রঙ মিশিয়েছি। আমার মনে হত, এই বাড়ির প্রতিটা দেয়ালের মধ্যেই যেন রঙের স্পন্দন আছে।
আমি তখন নানাভাবে সূর্যমুখী আঁকতে শুরু করি। আজ লোকে হয়তো ভাবে আমি কেন শুধুই সূর্যমুখী ফুল এঁকেছি। আসলে আমি যে আলো আঁকছিলাম।
ইয়েলো হাউসের সবচেয়ে নজরকাড়া ঘর ছিল আমার শোবার ঘর। আমি চেয়েছিলাম, আমার শোবার ঘরের ছবিটা দেখলে যেন মানুষের মনে শান্তি আসে। তাই ‘দ্য বেডরুম’ ছবিতে আমি ইচ্ছে করেই সরলরেখা আর উজ্জ্বল রঙ ব্যবহার করেছিলাম, নীল দেয়াল, হলুদ খাট, লাল কম্বল। আমার ভিতরে তখন নানা অস্থিরতা কাজ করা সত্ত্বেও সেই ছবিতে আমি নিজের কাঙ্ক্ষিত শান্তিকে আঁকতে চেয়েছিলাম।
আমি তখন নানাভাবে সূর্যমুখী আঁকতে শুরু করি। আজ লোকে হয়তো ভাবে আমি কেন শুধুই সূর্যমুখী ফুল এঁকেছি। আসলে আমি যে আলো আঁকছিলাম। মৃত্যুর মাঝেও যে আলো থাকে, তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করছিলাম। আমি রং এত পুরু করে লাগাতাম যে কখনও কখনও মনে হত, আমি ছবি আঁকছি না, মাটির প্রলেপ দিচ্ছি। আমি চাইতাম মানুষ শুধু ফুল না দেখে তার উত্তাপও অনুভব করুক।
রাত আমাকে বরাবরই টানত। এমনও হয়েছে অনেক রাতে আমি টুপিতে মোমবাতি বেঁধে ছবি এঁকেছি। কারণ রাতের রং যে দিনের আলোয় ধরা যায় না। এক সন্ধ্যায় ক্যাফের হলুদ আলো আর রাতের নীল আকাশ দেখে আঁকলাম Café Terrace at Night। তখনই বুঝলাম, রাত অন্ধকারের নয়— রাতেরও রং আছে।
সেই সময় চেয়েছিলাম, শিল্পী পল গগ্যাঁ এসে আমার সঙ্গে থাকুক। মনে হয়েছিল, আমরা একসঙ্গে থাকলে হয়তো এক নতুন ধরনের শিল্পের জন্ম দিতে পারব। অনেক অনুরোধের পরে অবশেষে পল গগ্যাঁ ইয়েলো হাউসে এলেন। প্রথমদিকে আমরা অনেক কিছু নিয়ে কথা বলতাম, ছবি, রঙ, ভবিষ্যৎ। কিন্তু ধীরে ধীরে আমাদের সম্পর্কের মধ্যে তীব্র সংঘাত তৈরি হতে লাগল। কারণ আমাদের মতের মিল হত না। আমি আবেগ দিয়ে ছবি আঁকতাম, আর গগ্যাঁ অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী আর তাত্ত্বিক ছিলেন। আমাদের স্বভাব একেবারেই আলাদা ছিল। তাই ঈশ্বরের বোধহয় আমাদের এই সহাবস্থান সহ্য হয়নি।
সেদিন প্রবল ঝগড়ার পর গগ্যাঁ জানিয়ে দিল, সে আর্ল ছেড়ে চলে যাবে। কথাটা শুনে মনে হল আমার ভিতরের শেষ আশ্রয়টুকুও ভেঙে পড়ছে। মাথার ভিতরে যেন ঝড় উঠল।
ইয়েলো হাউসের ঘরগুলো ধীরে ধীরে উত্তেজনা, তর্ক আর মানসিক অস্থিরতায় ভরে উঠতে লাগল। তবু আমি মরিয়া হয়ে সেই স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছিলাম। ১৮৮৮ সালের ডিসেম্বরের সেই ভয়ংকর রাত আজও আমার স্মৃতিতে আগুনের মতো ছ্যাঁকা দেয়।
সেদিন প্রবল ঝগড়ার পর গগ্যাঁ জানিয়ে দিল, সে আর্ল ছেড়ে চলে যাবে। কথাটা শুনে মনে হল আমার ভিতরের শেষ আশ্রয়টুকুও ভেঙে পড়ছে। মাথার ভিতরে যেন ঝড় উঠল। চারদিকে সবকিছু ঘুরছিল। গগ্যাঁ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে আমি কিছুক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। তারপর এক অদ্ভুত মানসিক অন্ধকার আমাকে গ্রাস করল।
আমি ঘরে ফিরে এলাম। সামনে পেলাম একটা ধারালো রেজার।
সেই মুহূর্তে আমি আর আমি ছিলাম না।
প্রবল মানসিক উত্তেজনা, আতঙ্ক, হতাশা আর অসহ্য নিঃসঙ্গতার মুহূর্তে আমি নিজের বাঁ কানের একটা বড় অংশ কেটে ফেললাম। মুহূর্তের মধ্যে রক্তে ভেসে গেল ঘর। যন্ত্রণায় শরীর কাঁপতে লাগল, কিন্তু তার থেকেও ভয়ংকর ছিল আমার ভিতরের অস্থির ভাব। মনে হচ্ছিল, নিজের শরীর নয়, আমি যেন নিজের আত্মাকেই ছিন্নভিন্ন করছি।
পরদিন সকালে পুলিশ আমাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেল। খবর পেয়ে থিও ছুটে এল। সে আমার বিছানার পাশেই বসে ছিল। সেদিনই প্রথম আমি থিও’র চোখে সত্যিকারের ভয় দেখেছিলাম।
তারপর কাটা কান একটা কাপড়ে মুড়ে আমি আর্লের এক পতিতালয়ে গেলাম। সেখানে র্যাশেল নামে এক তরুণীর হাতে সেটা দিয়ে বললাম, ‘এটা খুব যত্ন করে রেখে দিও।’ কাটা কান দেখে মেয়েটা আতঙ্কে অজ্ঞান হয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে পুলিশ আমাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেল। খবর পেয়ে থিও ছুটে এল। সে আমার বিছানার পাশেই বসে ছিল। সেদিনই প্রথম আমি থিও’র চোখে সত্যিকারের ভয় দেখেছিলাম।
আর্ল শহরের মানুষ তখন আমাকে পাগল বলতে শুরু করেছে। সবাই আমাকে দেখে ভয় পেত। অনেকে অভিযোগও করেছিল, আমাকে যেন আর আর্লে থাকতে না দেওয়া হয়। হয়তো তারা ভুলও বলেনি। কখনও আমি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকতাম, আবার হঠাৎ গভীর মানসিক অবসাদে ডুবে যেতাম। খিঁচুনি হত, নানারকম শব্দ শুনতাম, ভয়ে কাঁপতাম। তবু আঁকা থামাইনি। শেষ পর্যন্ত আমি নিজেই রাজি হলাম অন্য কোথাও চলে যেতে। ভাবলাম সেখানে হয়তো অন্তত নিজেকে আঘাত না করে বাঁচতে পারব।
শেষ পর্যন্ত আমাকে ফ্রান্সের ছোট্ট শান্ত শহর সেন্ট-রেমি-দ্য-প্রোভঁসের কাছে এক মানসিক আশ্রম সাঁ-পল-দ্য-মজোলে আনা হল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় জায়গাটা যেন কোনও পুরনো মঠ। পাথরের দেয়াল, লোহার গেট, সরু করিডর, নিস্তব্ধ উঠোন, একটা চাপা নীরব পরিবেশ। আর তার মধ্যে লুকিয়ে ছিল অসংখ্য ভাঙা মানুষের আর্তনাদ।
আমার ছোট্ট ঘরের মোটা লোহার গরাদ লাগানো জানালার বাইরের সাইপ্রাস গাছ, জলপাইয়ের বাগান আর প্রোভঁসের খোলা আকাশ আমার কাছে এক নতুন প্রকৃতির রূপ নিয়ে হাজির হল।
প্রথম প্রথম আশ্রমের পরিবেশ আমার কেমন অদ্ভুত আর ভয়ের মনে হত। রাতের বেলা করিডরের ভিতর থেকে চিৎকার ভেসে আসত। কেউ হঠাৎ হাসছে, কেউ কাঁদছে, কেউ আবার নিজের সঙ্গেই কথা বলছে। মাঝে মাঝে দূরের কোনও ঘর থেকে দরজায় ধাক্কার শব্দ শোনা যেত। মনে হত, প্রত্যেকে যেন নিজের ভিতরের অন্ধকারের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। আর আমি? আমিও তো তাদেরই একজন।
আমার ছোট্ট ঘরের মোটা লোহার গরাদ লাগানো জানালার বাইরের সাইপ্রাস গাছ, জলপাইয়ের বাগান আর প্রোভঁসের খোলা আকাশ আমার কাছে এক নতুন প্রকৃতির রূপ নিয়ে হাজির হল। এখানে ভোরের আলো পাহাড়ের গায়ে পড়লে মনে হত আকাশ কাঁপছে। আর রাতের উজ্জ্বল তারারা যেন হাতছানি দিয়ে ডাকত, মনে হত ওরা স্থির নয়, ওরা ঘুরছে, জ্বলছে, নিশ্বাস নিচ্ছে।

এখানে আসার পর আমার শরীরটা ভাল যাচ্ছিল না। বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছিলাম। কখনও ভীষণ অস্থির লাগত, কখনও দিনের পর দিন গভীর হতাশায় ডুবে থাকতাম। এমনও সময় গেছে, যখন তুলি ধরার শক্তিটুকুও পেতাম না। কিন্তু যখনই সুস্থ থাকতাম, আমি উন্মাদের মতো ছবি আঁকতাম। জানতাম, আমার সময় খুব কম। এই উন্মত্ততার মধ্যেই জন্ম নিল আমার জীবনের কিছু বিখ্যাত ছবি। জানালার বাইরে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে আঁকলাম ‘স্টারি নাইট’। ঘূর্ণায়মান নীল আকাশ, আগুনের মতো জ্বলতে থাকা তারা, কালো সাইপ্রাস গাছ, সবকিছুই ছিল আমার অস্থির মনের প্রকাশ। আমি শুধু আকাশই আঁকিনি; আঁকতে চেয়েছিলাম মানুষের নিঃসঙ্গতা, ভয়, বিস্ময় আর তা সত্ত্বেও নিজের প্রতি আকর্ষণকে।
সেন্ট-রেমির আশ্রম ছিল একই সঙ্গে কারাগার আর আশ্রয়। সেখানে যেমন ভেঙে পড়েছিলাম, আবার সেখানেই আমার শিল্প এক অদ্ভুত গভীরতা পেয়েছিল। আমার চারপাশে ছিল অসুস্থতা, নিঃসঙ্গতা আর মৃত্যুর ছায়া, তবু সেই অন্ধকারের মধ্যেও আমি প্রাণপণে আলো খুঁজতাম। কারণ তখনও আমার বিশ্বাস ছিল, পৃথিবী যতই নিষ্ঠুর হোক, আকাশের তারাগুলো কখনও সম্পূর্ণ নিভে যাবে না।
আমি ধীরে ধীরে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়তে লাগলাম। মনে হচ্ছিল, পৃথিবী বোধহয় আমাকে আর সহ্য করতে পারছে না। মৃত্যুর সেই হাতছানির মধ্যেও প্রকৃতিই একমাত্র, যাকে আমি আন্তরিকভাবে ভালবাসতে পেরেছিলাম।
তা সত্ত্বেও বলব, আমার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল রঙগুলোর জন্ম হয়েছিল সেই ছোট্ট ইয়ালো হাউসের ভিতরেই।
সেন্ট-রেমির আশ্রম থেকে ছাড়া পেয়ে ওভের-সুর-ওয়াজে এসে ডাক্তার পল গাশের তত্ত্বাবধানে আমি নতুন করে বাঁচার চেষ্টা শুরু করলাম। তখন আমি পাগলের মতো প্রতিদিন ছবি আঁকছি। মাত্র কয়েক সপ্তাহে অসংখ্য ছবি এঁকে ফেললাম। কিন্তু যতই আঁকছিলাম, ততই মনে হচ্ছিল, আমার ভিতরের শূন্যতা আরও জেঁকে বসছে।
আস্তে আস্তে আমি যখন বুঝতে পারছিলাম আমার দিন ফুরিয়ে আসছে, আমি আরও দ্রুত ছবি আঁকতে শুরু করলাম, সময় যেন ফুরিয়ে না যায়। গমের ক্ষেত, কালো কাক, ঝড়ো আকাশ— এরাই বারবার ফিরে আসছিল আমার ক্যানভাসে। সেই সময় আঁকলাম Wheat field with Crows। অনেকে ভাবে ছবিটা শুধু একটা প্রাকৃতিক দৃশ্য। কিন্তু আমি জানি, এই ছবি ছিল আমার ভিতরের ছবি। যেখানে রাস্তার কোনও শেষ নেই, আর কাকগুলো যেন মৃত্যুর দূত হয়ে উড়ে যাচ্ছে।
আমি ধীরে ধীরে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়তে লাগলাম। মনে হচ্ছিল, পৃথিবী বোধহয় আমাকে আর সহ্য করতে পারছে না। মৃত্যুর সেই হাতছানির মধ্যেও প্রকৃতিই একমাত্র, যাকে আমি আন্তরিকভাবে ভালবাসতে পেরেছিলাম। প্রতিদিন সে আমার কাছে নতুন নতুন বেশে ধরা দিত।
১৮৯০ সালের জুলাই মাস। আকাশে তখন গ্রীষ্মের ভারী আলো। ফ্রান্সের ছোট্ট গ্রাম ওভের-সুর-ওয়াজের চারদিকে বিস্তীর্ণ গমক্ষেত সোনালি ঢেউয়ের মতো দুলছে। বাতাসে শুকনো ঘাসের গন্ধ, দূরে কাক উড়ছে কালো ছায়ার মতো। বাইরে থেকে সবকিছু শান্ত দেখালেও, আমার ভিতরে তখন একটানা এক অস্থিরতার ঝড় বয়ে চলেছে।
জুলাই মাসের সেই বিকেলে আমি একা বেরিয়ে পড়লাম গমক্ষেতের দিকে, সঙ্গে ছিল একটা ছোট্ট রিভলভার। ঠিক কী ভাবছিলাম, আজও হয়তো কেউ জানে না। আমি কি সত্যিই মরতে চেয়েছিলাম?
থিও’ও তখন নিজের জীবন নিয়ে বিপর্যস্ত। তার শরীর ভাল যাচ্ছিল না, চাকরির ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত, সংসারের চাপ বাড়ছে। সারা জীবন যে মানুষটা আমাকে আগলে রেখেছে, আমার জন্য টাকা পাঠিয়েছে, আমার প্রতিটা ব্যর্থতায় পাশে দাঁড়িয়েছে— আমি হঠাৎ অনুভব করতে শুরু করলাম, আমি যেন তার উপর এক অসহনীয় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছি। সেই চিন্তা আমাকে ভিতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।
জুলাই মাসের সেই বিকেলে আমি একা বেরিয়ে পড়লাম গমক্ষেতের দিকে, সঙ্গে ছিল একটা ছোট্ট রিভলভার। ঠিক কী ভাবছিলাম, আজও হয়তো কেউ জানে না। আমি কি সত্যিই মরতে চেয়েছিলাম? নাকি কেবল নিজের মাথার ভিতরের সেই অবিরাম অস্থির করা শব্দগুলো থামাতে চেয়েছিলাম? নাকি আমি শুধু একটু নীরবতা খুঁজছিলাম— একটু বিশ্রাম।
গমক্ষেতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারদিক দেখছিলাম। আকাশটা অদ্ভুত বিশাল। বাতাসে গমের শীষগুলো কাঁপছিল, যেন সমুদ্রের ঢেউ। দূরে উড়ে যাওয়া কাকগুলোকে কালো দাগের মতো দেখাচ্ছিল। সেই মুহূর্তে পৃথিবীটাকে একই সঙ্গে অসম্ভব সুন্দর অথচ অসহ্য নিষ্ঠুর বলে মনে হতে লাগল।
তারপর গুলির শব্দ।
মৃত্যু কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এল না। গুলিটা আমার বুক ভেদ করলেও আমি তখনও বেঁচে ছিলাম। আহত শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে এলাম আমার ওবের্জ রাভু সরাইখানায়। কেউ ঠিক বুঝতেই পারেনি, প্রথমে কী হয়েছে। পরে মালিক যখন জানল, তখন ডাক্তার ডাকাল। কিন্তু গুলিটা বের করা গেল না। খবর পেয়ে থিও ছুটে এল। সেই মানুষটা, যে সারা জীবন আমার একমাত্র আশ্রয় ছিল। শক্ত করে আমার হাত ধরে চুপ করে আমার বিছানার পাশে বসে রইল। ঘরের ভিতর তখন এক ধরনের শান্ত নীরব পরিবেশ। বাইরে রাত নেমে আসছিল।
আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম মানুষের জীবনের অপূর্ণতা, একাকিত্ব আর অন্তহীন ব্যথা কখনও শেষ হয় না। আমি কিন্তু আমার ভিতরের অন্ধকারকে মুছে ফেলতে সারাজীবন আলোই খুঁজেছি।
আমি থিও’র দিকে তাকিয়ে শুধু বলেছিলাম, ‘লা ত্রিস্তেস দ্যুরেরা তুজুর।’ অর্থাৎ ‘দুঃখ চিরকাল থাকবে।’
আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম মানুষের জীবনের অপূর্ণতা, একাকিত্ব আর অন্তহীন ব্যথা কখনও শেষ হয় না। আমি কিন্তু আমার ভিতরের অন্ধকারকে মুছে ফেলতে সারাজীবন আলোই খুঁজেছি।
দু’দিন পর ১৮৯০ সালের ২৯শে জুলাই, মাত্র সাঁইত্রিশ বছর বয়সে, আমি মারা যাই। থিও তখনও আমার পাশেই ছিল।
এরপর থিও’ও বেশিদিন বাঁচেনি। আমার মৃত্যুর পর আমার ঘরে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ছবি, সূর্যমুখী, তারা ভরা আকাশ, গমক্ষেত, সাইপ্রাস গাছ আর সঙ্গে আমার চিঠিগুলো থিও’র স্ত্রী জোহানা বাঁচিয়ে রেখেছিল। অদ্ভুত লাগে যখন দেখি, জীবদ্দশায় যার মাত্র একটা ছবি বিক্রি হয়েছিল— The Red Vineyard, এখন তারই ছবি লোকে কোটি কোটি টাকায় কেনে। মানুষ আমার ‘সূর্যমুখী’র সামনে দাঁড়িয়ে বিস্মিত হয়, ‘স্টারি নাইট’ দেখে পাগল হয়ে যায়।
মানুষ বলে আমি নাকি ভীষণ প্রতিভাবান ছিলাম। কিন্তু কেউই হয়তো জানে না, আমার প্রতিটা ছবির পিছনে আছে খিদে, প্রত্যাখ্যান, মানসিক অস্থিরতা আর একাকিত্ব, যাদের আমি শুধু রং দিয়ে ছুঁতে চেয়েছিলাম।
আর যদি সত্যিই কেউ জানতে চায় আমি জীবনের কোন সময় সবচেয়ে বেশি বেঁচেছিলাম; তবে বলব, সেই মুহূর্তগুলোতে, যখন রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হত তারারা নিঃশ্বাস নিচ্ছে, অথবা যখন গমক্ষেতের উপর শেষ বিকেলের আলো পড়ে হলুদ রং আগুনের মতো জ্বলে উঠত।
সেই মুহূর্তগুলোয় মনে হত জীবন কত সুন্দর!
তথ্যসূত্র: দ্য লাস্ট ফর লাইফ – অরভিং স্টোন
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত