(Bakshe Rahasya)
এই দেখো দেখো, আরেকটা ছবি পেয়েছি। — বর্ণালি যথেষ্ট উত্তেজিত।
রূপক ততটাই বিরক্ত। এই এক জ্বালা হয়েছে। চার মাস হল এজরা স্ট্রিটে এই নতুন বাড়িটা তারা কিনেছে এক ইহুদির থেকে। কলকাতায় আর ইহুদি পরিবার নেই বললেই চলে। সবাই বাড়ি বিক্রি করে ইংল্যান্ডে, অস্ট্রেলিয়ায়, কিংবা নিজের দেশ ইজরায়েলে পাড়ি দিয়েছে। রুবেন কোহেনও বহু বছর আগে আমেরিকায় চলে গেছিল। শহরে পড়ে থাকা এই পরিত্যক্ত পৈতৃক বাড়িটা বেচতেই তার এবার আসা। রূপকরা তাই খুব ভাল ডিল পেয়ে গেল। রুবেনও ঝঞ্ঝাটমুক্ত হল। শর্ত একটাই। বাড়িটা ফার্নিশড অবস্থায় কিনতে হবে। রুবেনের হাতে সময় অল্প। এর মধ্যে বাড়ির জিনিসপত্র আলাদা করে বিক্রি করতে সে পারবে না। রাজি হয়ে গেছিল রূপক-বর্ণালি।
বাড়িতে জিনিস অল্পই ছিল। একটা পুরনো আমলের বড় ঝাড়লণ্ঠন, সোফাসেট, একটা ডিভান, কিছু ওয়ার্ড্রোব ইত্যাদি। পুরনো টুকিটাকি জিনিস বিদায় করে, রূপক-বর্ণালি বাড়ি গোছাতে লেগে গেল। এক সপ্তাহ পরে তারা একটা গৃহ-প্রবেশের অনুষ্ঠান প্ল্যান করেছে। তার মধ্যে সব রেডি করতে হবে।
আর তখনই এক এক করে এইসব পুরনো আঁকা ছবি, বই, দিনপঞ্জি লেখা ডাইরির কিছু ছেঁড়া কাগজপত্র বেরোতে শুরু করল বাড়ির বিভিন্ন কোণ, ওয়ার্ড্রোবের ভিতর, সিঁড়ি-ঘরের সাইড ইত্যাদি জায়গা থেকে। সম্ভবত রুবেনও জানত না এইসব ছবির কথা। জানলেই বা কী– সে তো জিনিসপত্রসমেত বাড়ি বিক্রি করেছে, অতএব এসবের মূল্য তার কাছে ছিল না নিশ্চয়ই। রূপকের কাছেও ছিল না। সে গাদা করে কাবাড়িওয়ালাকে দেবে বলেই ঠিক করেছিল। বাধ সাধল বর্ণালি। তার এই আঁকা ছবিগুলো বেশ পছন্দ হয়ে গেছে।

ইতিহাসের ছাত্রী বর্ণালির কাছে পুরনো দিনপঞ্জি লেখা কাগজ, বইগুলোরও বিরাট দাম। মজার ব্যাপার হল– এই ছবিগুলোর মালিক ইহুদি হলেও, সেগুলি কেমন যেন হিন্দুদের ধর্মীয় আচার-ব্যবহারের ইঙ্গিত বহন করে। বেশ পাকা হাতে আঁকা। বর্ণালি এক এক করে ছবিগুলো সাজিয়ে রাখতে শুরু করল— ড্রয়িং রুমের টেবিলে, শো-কেসে, আলমারির উপরে। আর দিনপঞ্জিটাও গুছিয়ে রাখল সেন্টার কফি টেবিলে এই বলে যে, এটা হল তখনকার সমাজ ব্যবস্থার দলিল; গৃহপ্রবেশে এসে সবাই দেখবে; নিশ্চয়ই তারিফ করবে।
আর তাতেই রূপকের বিরক্তি। এগুলো যে মর্ডান ডেকরেশনের সাথে যায় না, এটা কি বর্ণালি বুঝতে পারছে না। যত রাজ্যের পুরনো, ছেঁড়া কাগজপত্র, ময়লার ঢিবি আর সেটা নাকি ডিসপ্লে থাকবে আমাদের বসার ঘরে। সত্যি, কান্ডজ্ঞান বলে কিছু নেই।
এত সব ছবির মধ্যে মাত্র একটাই রূপকের চেনা লাগল। সেটা হল ‘দ্য লাস্ট সাপার’। দ্য ভিঞ্চির আঁকা থেকে তোলা ছবি। মজার ব্যাপার এই ছবিটা একটা কাঠের বাক্সের ঢাকনার উপর লাগানো ছিল। অনেকটা হারমোনিয়ামের মতন দেখতে বাক্সটা। এমনকি কিবোর্ডের মতন কালো, সাদা কি গুলোও আছে। বর্ণালি সেটাকেও একটা মোড়ার উপর সাজিয়ে রাখবে— কী যে বিরক্তিকর। প্রতিবারের মতন এবারও বর্ণালির কথাই শেষ অবধি থাকল।
কুঁকড়ে ওঠে রূপক। এমনিতেই এই কলিগরা তাকে বেশ হিংসা করে। এজরা স্ট্রিটে নতুন বাড়ি কিনেছে, তাতেও নিশ্চয়ই এদের গাত্রদাহ হচ্ছে। কিন্তু কীই বা বলতে পারে সে।
গৃহপ্রবেশের দিন যথারীতি অনেক লোকের সমাগম হল। সবাই ঘর সাজানোর তারিফ করলেও, রূপকের কেমন যেন মনে হচ্ছিল, এই বুঝি কেউ কোনও তির্যক মন্তব্য করল সেই সব ছবি, দিনপঞ্জি, ইত্যাদি দেখে। পুজো-আচ্চা, খাওয়াদাওয়া সেরে, সবাই যখন হাল্কা চালে আড্ডা দিতে বসেছে, ঠিক তখনই ধেয়ে এল রূপকের কলিগ অনীকের কমেন্ট— “সবই ঠিক আছে, রূপক, কিন্তু তোমাকে তো নাস্তিক বলেই জানতাম। এই গৃহপ্রবেশের পুজোও তো শুনলাম বৌদির জোরাজুরিতে, তা ঘরে এত রকম হিন্দুদের ধর্মীয় আচার-ব্যবহারের ছবিও কি সব বৌদির ইচ্ছায় নাকি…”
সঙ্গে সঙ্গে খেই ধরে আরেক কলিগ সুরজিত টিপ্পনি কাটল— “শুধু বৌদির ইচ্ছায় কি হয়, নিশ্চয়ই রূপকের প্রচ্ছন্ন সায় আছে। তবে যাই বল— ব্যাপারটা কিন্তু রূপক বেশ সেকুলার রেখেছে— হিন্দু ধর্মীয় আচার থেকে শুরু করে একেবারে যিশুখ্রিস্ট অব্দি কাউকেই বাদ দেয়নি। আর আমরা কতটুকুই বা জানি। রূপক যে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গায়, তাও কি আমরা জানতাম”— বলে চোখ টিপল সে।

কুঁকড়ে ওঠে রূপক। এমনিতেই এই কলিগরা তাকে বেশ হিংসা করে। এজরা স্ট্রিটে নতুন বাড়ি কিনেছে, তাতেও নিশ্চয়ই এদের গাত্রদাহ হচ্ছে। কিন্তু কীই বা বলতে পারে সে।
“এগুলো যে হিন্দুদের ধর্মীয় আচার-ব্যবহারের ছবি, সেটা আপনাকে বলল কে”— দাঁতে পাইপ চেপে, সোফায় বসতে বসতে, চিবিয়ে চিবিয়ে কথা গুলো বলল মানিকদা। ডঃ মানিক চক্রবর্তী— বর্ণালির কলেজের নৃতত্ত্ব বা অ্যানথ্রোপলজি বিভাগের সিনিয়ার প্রফেসর। অগাধ জ্ঞান। পণ্ডিত ব্যক্তি। বর্ণালি, রূপককে খুব স্নেহ করেন।
সময়টা ১৭০-১৮০ খ্রিস্টাব্দ হবে। গ্রিস, রোম, মিশরে তখন রাজা এপিফেনাসের শাসনকাল। তিনি ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ টোরাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন এবং আরও অনেক ইহুদি প্রথার উপর হুলিয়া জারি করলেন।
“কেন ওই পঞ্চ দিয়ার ছবিটা, বা ওই ছাদনা তলায় বিয়ের প্রস্তুতি, এমনকি ওই দিনপঞ্জিটা কিছুটা পাতা ওল্টালেই দেখবেন, দুর্গাপুজোর সময়টা ক্যালেন্ডারে মার্ক করা আছে, এর পরেও বলবেন…” সুরজিত আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, মাঝপথেই কথা কেড়ে নিল মানিকদা— “ক্যালেন্ডারে কি কোথাও লেখা আছে দুর্গাপুজোর দিন, সময়, নির্ঘণ্ট ইত্যাদি?”
“অ্যাঁ”— ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে সুরজিত।
“অ্যাঁ নয়, হ্যাঁ। ঠিকই শুনেছেন। এই ছবিগুলো কোনওটাই হিন্দুদের ধর্মীয় আচারের সঙ্গে জড়িত নয়। এগুলো সব ইহুদিদের। ব্যাপারটা একটু খুলে বলি। হিন্দুদের সাথে ইহুদিদের অনেক মিল। যেটাকে আপনি পঞ্চ দিয়া বলছেন, সেটা আসলে ইহুদিদের মেনোরা, যেটা ওরা হানুকার সময় জ্বালায়। আর যেটাকে আপনি দুর্গাপুজোর সময় ভাবছেন, সেটা আসলে ইয়োম কিপ্পুর। ইহুদি বিশ্বাসে ইয়োম কিপ্পুরকে বছরের সবচেয়ে পবিত্র দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই সময়, ইহুদিরা সারাদিন কিছু খায় না বা পান করে না। এই দিনে তারা প্রভুর বিরুদ্ধে করা পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য উপবাস করে ও ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করে। আর রইল বাকি আপনার ছাদনাতলা, সে তো ইহুদিদের বিয়েতেও ব্যবহৃত হয়। মিলের এখানেই শেষ নয়। আরও অনেক আছে। ইন ফ্যাক্ট, গল্প অনুযায়ী হিন্দু ও ইহুদিদের একই উৎপত্তি স্থলও হয়তো।”

“কীরকম, শুনি”— প্রশ্নটা বর্ণালির তরফে এলেও, গল্পের সন্ধানে আমরা সবাই তখন বেশ খানিকটা উৎসুক।
মানিকদা একটু দম নিতে থামলেন। তারপর পাইপে একটা লম্বা টান দিয়ে পরপর কয়েকটা ধোঁয়ার রিং ছাড়লেন। ম্যাকব্যারেন গোল্ড ব্লকের মিষ্টি তামাকের গন্ধে ঘরটা ভরে গেল। তারপর শুরু করলেন—
“সময়টা ১৭০-১৮০ খ্রিস্টাব্দ হবে। গ্রিস, রোম, মিশরে তখন রাজা এপিফেনাসের শাসনকাল। তিনি ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ টোরাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন এবং আরও অনেক ইহুদি প্রথার উপর হুলিয়া জারি করলেন। এর থেকে মুক্তি পেতে বেশ কিছু ইহুদি তখন একটি জাহাজে করে পালাল। বহু দিন ঘোরার পর, যখন তারা ভারতের মহারাষ্ট্র উপকূলবর্তী কোঙ্কন অঞ্চলে পৌঁছল, তখন যাত্রাপথে সম্মুখীন হল এক ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ের। উপকূলবর্তী ভারী ভারী পাথরে ধাক্কা লেগে, জাহাজডুবিও হল। অধিকাংশের সলিল সমাধি হল, মাত্র চোদ্দজন ছাড়া। এই নারীপুরুষেরা আছড়ে পড়েছিল আলিবাগের কাছে নওগাঁও নামে একটি গ্রামে। এরাই পরে বংশবিস্তার করে ভারতবর্ষে ইহুদি সম্প্রদায়ের শুরু করে। এরা নিজেদেরকে বেনে-ইস্রাইল বলে সম্মোধন করত— যার মানে, ইসরাইলের সন্তান। গল্পের গরুটা এইখানে একটু গাছে ওঠে।”— মানিকদা থামলেন।
মজা আরও আছে। শুধু উৎপত্তিতেই বেনে-ইস্রাইল-এর সাথে চিৎপাভন ব্রাহ্মণদের মিল আছে, তা নয়। আগে তো কয়েকটা বললামই। আরও অনেক কিছু মিল আছে। যেমন এদের পদবীতে মিল আছে।
“কেন”,— সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতন শুনছে।
মানিকদার পাইপের আগুনটা নিভে গেছিল। একটা পিন দিয়ে পাইপটা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তামাক পরিষ্কার করতে করতে আবার শুরু করলেন— “ঘটনাচক্রে ভারতের চিৎপাভন ব্রাহ্মণদের উৎপত্তিও কিন্তু অনেকটা একইরকম।”
“চিৎপাভন?”— সুরজিত হোঁচট খেলেও, প্রশ্নটা আমাদের সবারই ছিল।
“চিৎপাভন কোঙ্কনস্থ একটা ব্রাহ্মণ জাতি। এই বিনায়ক সাভারকর, নাথুরাম গডসে, গোপালকৃষ্ণ গোখলে, বিনোবা ভাবে— এরা সবাই চিৎপাভন ব্রাহ্মণ। চিৎপাভন কথাটার মানে— বিশুদ্ধ মনের মানুষ। ‘চিত্ত’ অর্থাৎ মন থেকে উৎপত্তি। আবার ভিন্ন মতে ‘চিতা’ থেকে কথাটা এসেছে। গল্পটা সেখানেই। স্কন্ধপুরাণ মতে, এমনই একটা জাহাজডুবির পর উপকূলে আছড়ে পড়া বেশ কিছু মৃতদেহ সৎকারের জন্য চিতায় তোলা হয়েছিল। এমন সময় সেখান দিয়ে অবতার পরশুরাম যাচ্ছিলেন। তখন তিনি ক্ষত্রিয়নিধনে নেমেছেন। এতগুলো শবকে একসঙ্গে দেখতে পেয়ে, তিনি মন্ত্রপুত জল ছিটিয়ে এদের আবার জীবিত করেছিলেন তাঁর হয়ে এই ক্ষত্রিয়নিধন যজ্ঞে নামানোর জন্য। সেই থেকে চিৎপাভন ব্রাহ্মণদের উৎপত্তি। এরা আবার নিজেদের যথেষ্ট উৎকৃষ্ট ভাবে। যেন ভগবানের উত্তরসূরি।”

“ইন্টারেস্টিং”, আমাদের সবার কৌতূহল বৃদ্ধি পেয়েছে।
“মজা আরও আছে। শুধু উৎপত্তিতেই বেনে-ইস্রাইল-এর সাথে চিৎপাভন ব্রাহ্মণদের মিল আছে, তা নয়। আগে তো কয়েকটা বললামই। আরও অনেক কিছু মিল আছে। যেমন এদের পদবীতে মিল আছে। হিন্দু চিৎপাভনরা বলে ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ অর্থাৎ ‘আমি ব্রহ্ম’, যেখানে ‘ব্রহ্ম’ মানে পরম সত্তা বা সর্বজনীন চেতনা। বেনে-ইস্রাইল বা ইহুদিদের ফার্স্ট কমান্ডমেন্ট বলে— ‘আই অ্যাম দা লর্ড’। ইহুদিদের তারা চিহ্নের মতন ম্যাগেন-ডেভিড প্রতীক কিন্তু হিন্দু ধর্মেও বর্তমান। শুধু দুর্গাপুজো আর ইয়োম কিপ্পুরের মিল আছে তাই নয়, ইহুদিদের পুরিম পরবও আমাদের দোলের সাথে একই সময় হয়। দুই ধর্মালম্বীরাই জুতো খুলে মন্দির বা সাইনাগগে প্রবেশ করে।”
বর্ণালি হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দেয়। উলটে পালটে অনেকক্ষণ ধরে বাক্সটা দেখে মানিকদা। তারপর বর্ণালির দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করেন— “তুই, পিয়ানো বাজানো শেখার সময় স্টাফ নোটেশন শিখেছিলিস না?”
“কী দারুণ না।”— বর্ণালি স্বভাবতই আপ্লুত এবং গর্বিত। রূপকের সঙ্কুচিত ব্যাপারটাও উধাও। যেন সত্যিই একটা একজিবিট-এর সামনে সে বসে। তবে এই পরিতৃপ্তিটা ক্ষনস্থায়ী হয়, যখন অনীক আবার ফোড়ন কাটে— “সবই তো বুঝলাম, কিন্তু ওই যে সুরজিত দেখাল ‘লাস্ট সাপারের’ ছবি লাগানো হারমোনিয়ামের বাক্সের মতন দেখতে ওই ওটা, ওটাও কি আসলে ইহুদিদের কোনও নিদর্শন? নাকি এবার বলবেন যে যিশুখ্রিস্ট নিজেই ইহুদি ছিল, অতএব…”
মানিকদার কপালে হাল্কা ভাঁজ।— “না সে তো বটেই, যিশু বা নাম ভিন্নে যশুয়া তো ইহুদি ছিলেনই, তবে এই লাস্ট সাপারকে সাধারণ কোনও স্পেসিফিক ধর্মের রীতিনীতির সাথে বেঁধে রাখার মানে হয় না। আমি বরং অন্য একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি…কই দেখি বাক্সটা…”

বর্ণালি হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দেয়। উলটে পালটে অনেকক্ষণ ধরে বাক্সটা দেখে মানিকদা। তারপর বর্ণালির দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করেন— “তুই, পিয়ানো বাজানো শেখার সময় স্টাফ নোটেশন শিখেছিলিস না?”
“হ্যাঁ, সে তো অনেকদিন আগের কথা, হঠাৎ এখন…”
“বলছি, বলছি”, মানিকদা সময় নেন। ধোঁয়াশা বাড়তে থাকে।
তারপর বলেন— “ভাল করে দেখ, …আপনারাও দেখুন… এটার ব্যাপারে আগে শুনেছিলাম বটে, কিন্তু এতটা খতিয়ে দেখবার সুযোগ হয়নি। সেটা হয়তো কিছুটা আমার সঙ্গীতের বিষয়ে কম জ্ঞানের জন্য, বিশেষ করে স্টাফ নোটেশন পড়ার ব্যাপারে”।
“এই বাক্সটা অদ্ভুত এক জিনিস বুঝলি। একে বলে মিউজিক্যাল বক্স। কিন্তু পাসওয়ার্ড প্রোটেকটেড। আজকালকার তথাকথিত পাসওয়ার্ড নয়। ম্যাজিক মিউজিক্যাল পাসওয়ার্ড।
“আরে কী বলছেন, পরিষ্কার করে বলুন না”— অনীক অধৈর্য হয়ে ওঠে।
“সবুরে মেওয়া ফলে, ব্রাদার”, মানিকদা ভণিতা করেন, “ইতালীয় সঙ্গীতশিল্পী জোভান্নি মারিয়া এই ছবির মধ্যে আশ্চর্য একটি সুর খুঁজে পেয়েছেন। ছবির উপর দিয়ে যদি পাঁচটা রেখা টানা হয়, মানে বর্ণালি তোর ওই স্টাফ নোটেশনের মতন, তাহলে, যশুয়ার শিষ্যদের হাত এবং পাঁউরুটির টুকরো এমন ভঙ্গিতে থাকবে, ঠিক যেন একটা মিউজিক নোটেশন”।
“কই দেখি, দেখি…” বর্ণালির সাথে বাকিরাও হামলে পড়েছে। বর্ণালি তাড়াতাড়ি একটা কাগজ এনে পাঁচটা সরল রেখা এঁকে ফেলল। তারপর ‘লাস্ট সাপার’ ছবি দেখে, আন্দাজে যিশুর শিষ্যদের হাত এবং পাঁউরুটির টুকরো বরাবর কয়েকটা নোটেশন কেটে ফেলল। আন্দাজ মতন বলে, প্রায় গোটা তিনেক সামান্য পার্থক্যের নোটেশন তৈরি হল— মানে এটাও হতে পারে বা ওটাও হতে পারে। “এবার?”— বড় বড় চোখে বর্ণালি তাকায় মানিকদার দিকে।
“এই বাক্সটা অদ্ভুত এক জিনিস বুঝলি। একে বলে মিউজিক্যাল বক্স। কিন্তু পাসওয়ার্ড প্রোটেকটেড। আজকালকার তথাকথিত পাসওয়ার্ড নয়। ম্যাজিক মিউজিক্যাল পাসওয়ার্ড। মানে, এই যে কিবোর্ডের মতন কালো, সাদা কি’গুলো আছে, ওগুলো দিয়ে একটা ঠিক ঠিক নোটেশন বাজালে, তবেই— ‘খুল যা সিম্ সিম্’”।
“ও মা, সত্যি”, বিস্ফারিত চোখে বর্ণালি জিজ্ঞেস করে— “আর পাসওয়ার্ড এই ‘লাস্ট সাপারের’ নোটেশন?”
“আমার ধারণা তাই। এবার পরীক্ষা করে প্রমাণ করাটা তোর কাজ।”
সবাই অধীর আগ্রহে দেখতে লাগল। বর্ণালি পারমুটেশন-কম্বিনেশন শুরু করল। মানে সম্ভাব্য তিনটে নোটেশন এক এক করে কিবোর্ডে বাজাতে লাগল। প্রথম ও দ্বিতীয়টা বাজানোয়, সামান্য অন্তরে, দারুণ দুটি স্তোত্র তৈরি হল। কিন্তু কাজের কাজ হল না, অর্থাৎ বাক্সটি খুলল না। সবাই কিছুটা দমে গেল। এদিকে বুকের ভেতর দামামা বাজছে। কী হয়, কী হয় ভাব। বর্ণালি যেই তৃতীয় স্তোত্রটি বাজাল— অমনি, ফট্ করে ম্যাজিকের মতন বাক্সটি আনলক হয়ে গেল।
প্রায় আধ ঘণ্টা, চল্লিশ মিনিট পর মানিকদা বলে উঠলেন— “করেছো কী রূপক ও বর্ণালি। তোমরা যে আস্ত একটা ইতিহাস খনন করে ফেলেছ। সাধু সাধু!”
সঙ্গে সঙ্গে আবার সবাই ঝুঁকে পড়েছে। মানিকদা সবাইকে নিরস্ত করে একে একে ভিতরের জিনিস বার করা শুরু করলেন। বেরিয়ে এল আরও বেশ কিছু নথি ও কাগজপত্র।
“কী এগুলো”— সবারই একই প্রশ্ন।
“তা তো এত সাত-তাড়াতাড়ি বলা যাবে না। আমাকে একটু সময় দিতে হবে, আর একটু স্পেস”— মানিকদা ঘোষণা করলেন। ওঁর ইঙ্গিত বুঝতে পেরে সবাই একটু তফাতে গিয়ে দাঁড়াল। অনীক আর সুরজিত সিগারেট খেতে বারান্দায় গেল। বোঝাই যাচ্ছে, বেশ কৌতূহলে ভুগছে। বাকিদেরও কম বেশি একই অবস্থা। অন্য কিছুতে মন যাচ্ছে না। ওদিকে মানিকদা এক মনে কাগজপত্রগুলো খুঁটিয়ে দেখছে। মাঝে বর্ণালিকে বলে একটা আতস কাঁচও আনিয়ে নিয়েছেন।
প্রায় আধ ঘণ্টা, চল্লিশ মিনিট পর মানিকদা বলে উঠলেন— “করেছো কী রূপক ও বর্ণালি। তোমরা যে আস্ত একটা ইতিহাস খনন করে ফেলেছ। সাধু সাধু!”
এতক্ষণে গর্বে রূপকের বুকটা ফুলে উঠেছে। তার ইতস্ততভাব উধাও। আবার মানিকদার কাছে ভিড়টা জমে উঠেছে। বর্ণালি একপ্রস্থ চা আর পকোড়া নিয়ে হাজির। মানিকদা একসঙ্গে গোটা তিন-চারেক পাকোড়া মুখে চালান করে দিয়ে শুরু করলেন—“ওরে এ হচ্ছে কলকাতায় ইহুদিদের বিস্তৃতি এবং ধীরে ধীরে লোপ পেয়ে যাওয়ার এক অসামান্য দলিল। মন দিয়ে শোনো সবাই। এই বাক্সে যা কিছু আছে তার আসল মালিক হচ্ছে শালোম কোহেন। এখন জানি না তোরা এই বাড়িটা যার কাছ থেকে কিনেছিস, তাদের সাথে শালোমের কী সম্পর্ক। তবে আমি যা জানি, তা হচ্ছে, এই শালোম কোহেন কলকাতায় আসা প্রথম ইহুদি। অবিশ্যি ভিন্ন মতও আছে। সেই ১৭৯৮ সালে তিনি কলকাতায় এসেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি আউধের নবাব ওয়াজির ঘাজি হাইদারের দরবারে যান কোর্ট জুয়েলার হয়ে। এই সব নথিপত্র হচ্ছে সেই সময়ের এক জীবন্ত ইতিহাস। কথিত আছে, তিনি নাকি নবাবের বিশেষ ঘনিষ্ঠ ছিলেন। নবাবের সাথে নাকি একই হাতিতে সওয়ার করেছিলেন, এবং সেই সময়ে তার মাসোহারা বরাদ্দ ছিল প্রায় ২০০০ টাকা। কোর্ট জুয়েলার হিসেবে তার বেশ নামডাক ছিল। এও শোনা যায়, শেষ বয়সে তিনি পাঞ্জাবে গিয়েছিলেন মহারাজা রঞ্জিত সিং-এর দরবারে কোহিনূর হিরের মূল্য নির্ধারণ করতে। বাই দ্য ওয়ে, তোমরা জানো নিশ্চয়ই বর্তমান কোহিনূর হিরেটা কিন্তু অংশবিশেষ মাত্র। সেই হিরের বাকি অর্ধেকটা আজও পাওয়া যায়নি। যাক, গে, ফিরে আসি শালোমের কথায়। এক সময়ে তার বিজনেস পার্টনারের সাথে কিছু মতান্তর হওয়ার পর, তিনি চুঁচুড়াতে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। অবিশ্যি কলকাতার বাড়িটিও তিনি বহাল রাখেন।”

মানিকদা দম নিতে থামলেন। সবাই গোগ্রাসে গিলছে। এক চুমুকে পুরো চা-টা খেয়ে মানিকদা আবার শুরু করলেন— “কিন্তু সব চেয়ে অবাক করা জিনিস এই মিউজিক্যাল বক্সে হচ্ছে এইটা।” এই বলে তিনি বাক্সটা থেকে একটা ছোট লাল মখমলের থলি বার করেছেন। ভেতরের আওয়াজে মনে হল যেন মোহর বা ওই জাতীয় কোনও কিছু আছে। অনীক চোখ বিস্ফারিত করে জিজ্ঞেস করল— “ওর মধ্যে কোহীনূরের হারিয়ে যাওয়া ভাঙা পার্টটা আছে না কি?”
রূপক আর বর্ণালির পরস্পরের দিকে তাকিয়ে গর্বের হাসি হাসল। সবই তো আপনি করলেন মানিকদা। আমরা শুধু দারুণ একটা গল্প পেলাম আপনার কাছে।
মানিকদা হেসে বললেন— “না ভাই, সেটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের দাবি হয়ে যেত। তবে যা আছে, তারও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক।” এই বলে সেই থলি থেকে তিনি একটা ছোট আধুলি সাইজের কয়েন বার করে নিজের ডান হাতের তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুষ্টের মধ্যে ধরে সবাইকে দেখালেন। “খুব কেয়ারফুলি দেখ— এই থলিতে এরকম আরও অনেক কয়েন আছে। এর এক দিকে দুটো মৎস্যকন্যা মুখোমুখি আছে। আরও আছে— দুটো বাঘ একটা ধ্বজা ধরে এবং সর্বোপরি একটা রাজার মুকুট। এই কয়েন সেই সময়ের যখন দিল্লির মসনদে মুঘল শাহ আলম দ্বিতীয়। মুঘলদের তখন পড়তি সময়। এই সময় নবাব ওয়াজির ঘাজি হাইদার নিজেকে রাজা বলে ঘোষণা করলেন। আর শুধু ঘোষণাই করলেন না, নিজের নামে কয়েন ইস্যু করলেন, মুঘল সলতানাতকে উপেক্ষা করে। এই কয়েনগুলি সম্পূর্ণ আলাদা রকমের ছিল— এখন যা দেখছ তোমরা। অতএব— তোমরা দারুণ একটা জিনিস আবিষ্কার করে ফেলেছ। ব্র্যাভো।”
রূপক আর বর্ণালির পরস্পরের দিকে তাকিয়ে গর্বের হাসি হাসল। “সবই তো আপনি করলেন মানিকদা। আমরা শুধু দারুণ একটা গল্প পেলাম আপনার কাছে। এবার এই মূল্যবান নথি ও কয়েনগুলোর একটা সঠিক ব্যবস্থা আপনাকেই করে দিতে হবে। আমি বরং আরেক কাপ চা নিয়ে আসি”— বর্ণালি বলল। সবাই আচ্ছন্ন ভাব থেকে বেরিয়ে এসে বলে উঠল— “হ্যাঁ হ্যাঁ আরেক কাপ চা হয়ে যাক।”
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত