(Sanat Kar)
ভারতীয় শিল্পকলা জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন সনৎ কর। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের প্রাক্তন অধ্যাপক সনৎ কর ছাপচিত্রর ক্ষেত্রে একাধিক নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। আন্তর্জাতিক প্রিন্ট-মেকিং পুরস্কার, শিরোমণি পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ললিতকলা একাডেমি পুরস্কার, বিশ্বভারতীর গগন-অবনী পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মানে সম্মানিত হন। ক্যালকাটা বয়েজ স্কুলে জীবনের অনেকটা সময় শিক্ষকতা করেন।
২০১১ সাল নাগাদ সনৎ করের সঙ্গে আমার পরিচয় শান্তিনিকেতনে ওঁর রতনপল্লীর বাড়িতে। উদ্দেশ্য ছিল সংবাদপত্রের জন্য ওঁর শিল্পীজীবন সম্পর্কে একটা সাক্ষাৎকার নেব। বসন্তের এক পড়ন্ত বিকেলে ওঁর বাড়িতে গেলে প্রথমে পেলাম উষ্ণ আপ্যায়ন ও তারপরে সাক্ষাৎকার। সেদিন সন্ধ্যায় মন খুলে সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন। শুনলাম ভবানীপুরের চক্রবেড়িয়া স্কুলে ওঁর ছাত্রজীবনের কথা, আর্ট কলেজে পড়ার অভিজ্ঞতা, মান্দার বিদ্যাপিঠে শিক্ষকতার কথা। এছাড়াও, ছাপচিত্রের বিষয়ে নানা আবিষ্কার এবং শান্তিনিকেতনের জীবনের কথা।
আরও পড়ুন: স্মৃতির আকাশ থেকে (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯), (১০), (১১), (১২), (১৩), (১৪), (১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯), (২০), (২১), (২২), (২৩), (২৪), (২৫), (২৬), (২৭), (২৮), (২৯), (৩০), (৩১), (৩২), (৩৩), (৩৪), (৩৫), (৩৬), (৩৭), (৩৮), (৩৯), (৪০), (৪১), (৪২), (৪৩), (৪৪), (৪৫), (৪৬)
ক্যালকাটা বয়েজ স্কুল ওঁর জীবনের একটা বড় অধ্যায় জুড়ে ছিল। সব থেকে ভাল লেগেছিল মাদার টেরেসার সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতিটি। শুধু প্রশ্নোত্তর পর্ব নয়, সঙ্গে কিঞ্চিৎ জলযোগ সহযোগে ছবি আঁকার পর্বও চলল। সনৎদা গল্প করতে খুব ভালবাসতেন। আরেকটা মজার ব্যাপার লক্ষ করেছিলাম, সেটা হল ওঁর কোনও প্রশ্নের উত্তর দিলে, ‘বেশ’ কথাটা বলা! একটা সুন্দর সন্ধ্যা কাটিয়ে যখন ফিরছি তখন আন্তরিকভাবেই বলেছিলেন, শান্তিনিকেতন গেলে যেন অবশ্যই ওঁর সঙ্গে দেখা করি। দূরাভাষের নম্বরটাও দিয়েছিলেন।
এরপরে বেশ কয়েকবার যখন শান্তিনিকেতনে গিয়েছি, তখনই সনৎদার সঙ্গে দেখা করেছি। আড্ডা দিতে ভালবাসার পাশাপাশি ভাল গল্পও বলতে পারতেন। আমি দক্ষিণ কলকাতার চক্রবেড়িয়া রোড এবং বেলতলা রোডের খুব কাছে থাকি শুনে ওঁর বাল্যকালের অনেক গল্প করতেন। ভবানীপুর সম্পর্কে ওঁর অন্যরকম ইমোশন কাজ করত, কারণ ছেলেবেলার বেশিরভাগ সময়টা ওই অঞ্চলে কেটেছিল। একদিন বলেছিলেন, ওঁদের বাড়ির খুব কাছেই অভিনেতা নির্মলকুমার থাকতেন। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগও ছিল।

এরপরে দেখতে দেখতে চলে এল করোনাকাল। আমরা সবাই ঘরবন্দি, তারই মাঝে শান্তিনিকেতন যাওয়ার সুযোগ এল, ট্রেনে নয় গাড়িতে। সেই সময় দু-তিন দিন নয় বেশ কিছুদিন থাকতাম, কিন্তু সনৎদার কাছে যেতাম না করোনাবিধি মেনে। ফোনে কথা হত। নিয়ম যখন একটু শিথিল হল, তখন আবার দেখা সাক্ষাৎ শুরু হল। উনি জিজ্ঞেস করতেন ঘরবন্দি অবস্থায় কীভাবে সময় কাটালাম।
আমি বলেছিলাম, ‘সারা রাত জেগে খুব ভোরে উঠে নীরব এবং স্তব্ধ কলকাতার ছবি তুলতাম।’ শুনে আবার সেই পরিচিত উত্তর, ‘বেশ’। সেইসব ছবি নিয়ে যখন বই প্রকাশিত হল, তখন সেই বই নিয়ে ছুটলাম ওঁর কাছে। খুব মন দিয়ে প্রতিটি পাতা উল্টোলেন। বলেছিলেন, ‘তোমার এই কাজটা একটা ভাল দলিল হয়ে রইল।’
‘শনিবারের চিঠি’-খ্যাত সজনীকান্ত দাসের নাতনি শ্রদ্ধেয়া সাগর মিত্র একবার আমার সঙ্গে সনৎদার বাড়িতে গেলেন আলাপ করতে। ওঁর বাড়িও শান্তিনিকেতনে। কিছুক্ষণ গল্প করার পরে সনৎদা সাগরদিকেও একটা ছবি এঁকে দিয়েছিলেন।
একদিন ফোন করে বললাম, কলকাতার এক নামি পুজো কমিটি শুধু পুজোই করে না, সঙ্গে প্রতি বছর একটা উচ্চমানের শারদীয়া পত্রিকা প্রকাশও করে। ওদের জন্য একটা ছবি এঁকে দিতে হবে। সেই প্রস্তাব বা আবদার করতে বললেন, ‘শান্তিনিকেতন চলে এস, দেখাও হবে আর ছবি আঁকাও হবে।’
ক্যালকাটা বয়েজের ওঁরই এক ছাত্রর সঙ্গে শান্তিনিকেতন গেলাম কিন্তু কী যে হল জানি না, সনৎদার বাড়ির রাস্তা গুলিয়ে ফেললাম! অনেক খোঁজার পরে গিয়ে পৌঁছলাম। ফোনে বলেছিলেন একটা ৮/১০-এর অ্যাসিড ফ্রি পেপার নিয়ে যেতে। সেটি ওঁর হাতে দেওয়ার পর মার্কার নিয়ে সাদা কাগজটি নান্দনিক রেখায় ভরিয়ে দিলেন।

অবাক হয়ে দেখলাম, নব্বই ছুঁইছুঁই চিত্রকর কী অসামান্য দক্ষতার সঙ্গে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই কাজটি শেষ করলেন! লাইন ড্রয়িং, কোথাও এতটুকু কমবেশি নেই। একেবারে নিখুঁত! ছবিটি ছিল বিপরীত দিকে মুখ করে দুটি নারীর অবয়ব, তাদের হাতে ফুল। একেবারে সনৎদার ঘরানার কাজ। ছোটখাটো মানুষ কিন্তু ঋজুদেহ আর প্রবল উৎসাহ নিয়ে স্বক্রিয়ভাবে কাজ করে চলেছেন।
‘শনিবারের চিঠি’-খ্যাত সজনীকান্ত দাসের নাতনি শ্রদ্ধেয়া সাগর মিত্র একবার আমার সঙ্গে সনৎদার বাড়িতে গেলেন আলাপ করতে। ওঁর বাড়িও শান্তিনিকেতনে। কিছুক্ষণ গল্প করার পরে সনৎদা সাগরদিকেও একটা ছবি এঁকে দিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে একটা মজার কথা বলে রাখি, সেটা হল সনৎদার কাছে ছবি এঁকে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে হত না। কোনও বই বা খাতায় কেউ ওঁকে সই করতে বললেই উনি একটা মোটা মার্কার দিয়ে আগে সেই বই বা গুণমুগ্ধের এগিয়ে দেওয়া খাতায় ছবি এঁকে তারপরে সই করতেন।
মনে পড়ে, উনি চলে যাওয়ার পরে যোগেনদা বলেছিলেন, ‘সনৎদা আর দ্বিতীয় কেউ হবে না।’ ভাল শিল্পী আর ভাল মানুষের সমন্বয় খুব একটা চোখে পড়ে না। সনৎদার মধ্যে দুই গুণেরই মেলবন্ধন ঘটেছিল।
মানুষটিকে সামগ্রিকভাবে জানার জন্য ওঁর জীবনীমূলক দু-একটি বই কিনে পড়তে শুরু করার পর কয়েকটি বিশেষ বিষয় সম্পর্কে ওঁকে প্রশ্ন করলে খুশি হয়ে সুন্দর সুন্দর সব গল্প বলতেন। সেইসব গল্পে চিত্রকলার পাশাপাশি সনৎদার জীবনদর্শনের কথাও জানতে পারতাম। ফেক আর্টের প্রসঙ্গে রাগ বা উত্তেজনা প্রকাশ না করে বলতেন, ‘কী করবে বল, আসলে টাকার প্রয়োজনেই এরকম করে।’
তাঁর চিত্রশিল্পী পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে ছিল একজন দরদী মনের মানুষ! বিশ্বভারতীর এক প্রাক্তন কর্মী মাঝে রটিয়ে বেড়িয়েছিলেন যে, সনৎদার সঙ্গে কলকাতার দু-একজন শিল্পীর সম্পর্ক তেমন ভাল নয়। কিন্তু সনৎদার সঙ্গে যত কথা বলতাম, ততই বুঝতে পারতাম প্রত্যেক শিল্পীর সঙ্গে ওঁর কী অসম্ভব ভাল এবং শ্রদ্ধার সম্পর্ক!

তিনি চলে যাওয়ার কয়েক মাস আগে দক্ষিণ কলকাতার বিড়লা একাডেমির কর্তৃপক্ষ ঠিক করেছিলেন সনৎদা, যোগেনদা এবং গণেশ হালুইকে সম্মান জ্ঞাপন করবে। সেটা শুনে আমি যখন ফোন করি, সনৎদা বলেন শরীর খারাপ থাকায় আসতে পারবেন না। বয়সজনিত কারণে শেষের দিকে কলকাতায় আসা প্রায় বন্ধই করে দিয়েছিলেন। কোনও বিশেষ প্রয়োজনে যখন আসতেন, তখন ট্রেনের বদলে গাড়িতেই আসতেন।
এর কিছুদিন পরে শীত যখন প্রায় বিদায় নেওয়ার জন্য প্রস্তুত, তখন সামান্য অসুস্থতার পর সনৎদাই বিদায় জানালেন নন্দনের জগতকে। মনে পড়ে, উনি চলে যাওয়ার পরে যোগেনদা বলেছিলেন, ‘সনৎদা আর দ্বিতীয় কেউ হবে না।’ ভাল শিল্পী আর ভাল মানুষের সমন্বয় খুব একটা চোখে পড়ে না। সনৎদার মধ্যে দুই গুণেরই মেলবন্ধন ঘটেছিল।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত