(Banashree Sengupta)
বাংলা সংগীতজগতের একটি অতি পরিচিত নাম বনশ্রী সেনগুপ্ত। শুধু পরিচিত বললে ভুল হবে, জনপ্রিয়ও বটে। বহু বিখ্যাত গীতিকার এবং সুরকারের কথা ও সুরে গান গেয়েছেন এই শিল্পী। জীবনে প্রথম তাঁর গান শুনেছিলাম কেশব চন্দ্র সেন স্ট্রিটে আমার মামাবাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে। ফাটাকেষ্টর কালীপুজোয় এসেছিলেন গান গাইতে।
যাঁরা ওখানে ঠাকুর দেখতে গেছেন বা এখনও যান, তাঁরা হয়তো দেখে থাকবেন প্রতি বছর রাস্তার উপরে একটা বড় মঞ্চ তৈরি করা হয় পুজোর কয়েকদিন শিল্পীদের অনুষ্ঠান করার জন্য। সেই মঞ্চেই বনশ্রী সেনগুপ্ত গান গেয়েছিলেন অনেকক্ষণ।
আরও পড়ুন: স্মৃতির আকাশ থেকে (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯), (১০), (১১), (১২), (১৩), (১৪), (১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯), (২০), (২১), (২২), (২৩), (২৪), (২৫), (২৬), (২৭), (২৮), (২৯), (৩০), (৩১), (৩২), (৩৩), (৩৪), (৩৫), (৩৬), (৩৭), (৩৮), (৩৯), (৪০), (৪১), (৪২), (৪৩), (৪৪), (৪৫), (৪৬), (৪৭)
ছাদের একটি বিশেষ কোন থেকে মঞ্চের শিল্পীকে স্পষ্ট দেখা যেত, সেখানে দাঁড়িয়েই আমরা ওঁর গান শুনেছিলাম। আমি তখন অনেকটাই ছোট তাই ঠিক কী কী গান গেয়েছিলেন, আজ আর মনে নেই। কিন্তু একটা গানের কথা মনে আছে, সেটা হল, ‘আজ বিকেলের ডাকে তোমার চিঠি পেলাম।’ ওই বিশেষ গানটি তখন রেডিওর ‘অনুরোধের আসরে’ প্রায়ই বাজানো হত।
এর কয়েক বছর পরে একদিন বিকেলে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে উনি এসেছিলেন, তখন আবার তাঁকে দেখি। সেদিন গান রেকর্ডিং সংক্রান্ত কোনও বিষয়ে কথা বলতে এসেছিলেন সম্ভবত। মায়ের সঙ্গে বনশ্রীদির পরিচয় কলকাতা দূরদর্শনে, ‘বিচিত্রা’ শিরোনামের অনুষ্ঠানে গান করতে গিয়ে।

মনে পড়ে, সেই সময় আমি প্রতি বছর নিয়ম করে দক্ষিণ কলকাতার বিড়লা একাডেমিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণবার্ষিকীতে একটা অনুষ্ঠান করতাম। তখন মা আমাকে বলেছিলেন, বনশ্রীদিকে ডাকতে। সামান্য ইতস্তত করছিলাম, কারণ ওরকম জনপ্রিয় একজন শিল্পীকে কীভাবে গান গাইবার কথা বলব! ওঁর পারিশ্রমিক দেওয়ার মতো ক্ষমতা আমাদের ছিল না, কারণ কোনওরকম স্পনসর ছাড়াই অনুষ্ঠানটা করতাম।
বাংলা গানের স্বর্ণযুগের অন্যতম শিল্পী ছিলেন তিনি। বাংলা সংগীতজগতে তাঁর আসন স্থায়ী করে দেওয়ার পিছনে সুধীন দাশগুপ্তর অবদান ছিল অনেকটাই। অনেক কুণ্ঠা নিয়ে একদিন বনশ্রীদির শাহনগরের বাড়িতে হাজির হলাম। মায়ের সঙ্গে পূর্বপরিচিতি ছিল বলে প্রাথমিক সৌজন্য বিনিময়ের পর খুব আন্তরিকভাবে আলাপ-পরিচয় করলেন। কথা দিলেন অনুষ্ঠানে আসবেন!
ওইদিনের অনুষ্ঠানে বনশ্রীদি ছাড়াও উৎপলা সেন, সবিতা চৌধুরী প্রমুখের আসার কথা ছিল, কিন্তু জল জমে যাওয়াতে আমি ভেবেছিলাম শুধু শিল্পীরা নয়, শ্রোতারাও আসতে পারবেন না। তবে শেষ পর্যন্ত শিল্পী এবং শ্রোতারা এসেছিলেন। এখনকার দিন হলে যে কী হত বলতে পারি না!
আসলে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে বনশ্রীদি ভীষণ শ্রদ্ধা করতেন। সে তো হল, কিন্তু অনুষ্ঠানের দিন আকাশভাঙা বৃষ্টি। যাঁরা বিড়লা একাডেমি চত্বরের সঙ্গে পরিচিত, তাঁরা জানেন যে সাদার্ন এভিনিউতে অল্প বৃষ্টিতেই কী পরিমাণ জল দাঁড়িয়ে যায়। আরেকটা কথা এখানে বলে রাখি, তা হল সেই বছর আমি একসঙ্গে হেমন্ত-সলিল স্মরণসন্ধ্যা করেছিলাম। কারণ, তার কিছুদিন আগেই সলিল চৌধুরীর জীবনাবসান হয়েছিল।
ওইদিনের অনুষ্ঠানে বনশ্রীদি ছাড়াও উৎপলা সেন, সবিতা চৌধুরী প্রমুখের আসার কথা ছিল, কিন্তু জল জমে যাওয়াতে আমি ভেবেছিলাম শুধু শিল্পীরা নয়, শ্রোতারাও আসতে পারবেন না। তবে শেষ পর্যন্ত শিল্পী এবং শ্রোতারা এসেছিলেন। এখনকার দিন হলে যে কী হত বলতে পারি না!

তারপর থেকে বনশ্রীদি প্রতি বছরই ওই অনুষ্ঠানে আসতেন। আমাকে প্রায়ই বলতেন, ‘একদিন সময় করে মাকে নিয়ে আমার বাড়িতে এস।’ একদিন মায়ের সঙ্গে ওঁর বাড়িতেও গেলাম। ততদিনে উনি শাহনগরের বাড়ি ছেড়ে প্রতাপাদিত্য রোডে একটা ফ্ল্যাটে থাকতেন। সারা সন্ধে আমার আর মায়ের সঙ্গে গল্প করে কাটালেন।
ততদিনে ওঁর স্বামীও মারা গেছেন। খুব একা হয়ে পড়েছিলেন। মায়ের সঙ্গে ফোনে মাঝে মধ্যেই যোগাযোগ হত। একবার আমাকে বলেছিলেন, ধর্মতলার পুরোনো রেকর্ডের দোকান থেকে ওঁর কয়েকটি ইপি রেকর্ড সংগ্রহ করে দিতে।
আমার দাদু কবি-গীতিকার অমিয় বাগচীর কথা শুনে উনি বেশ অবাক হয়ে যান, দাদুর লেখা আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া গানগুলো আবার নতুন করে শুনতে চাইলে আমি, ‘কথা কোয়োনাক শুধু শোনো’ শীর্ষক রেকর্ডটি ওঁকে উপহার দিই।
তপন সিংহ বিষয়ক বই, ‘অনুভবে তপন সিংহ’ নিয়ে যখন কাজ করছি, তখন প্রয়োজন হয়েছিল বনশ্রীদির একটা সাক্ষাৎকারের। তপনদার, ‘হারমোনিয়াম’ ছবিতে উনি গান গেয়েছিলেন। সাক্ষাৎকারে খুব সুন্দর একটা সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণ করেছিলেন।
এর কয়েক বছর পরে দেবকী কুমার বসুকে নিয়ে একটা চলচ্চিত্র উৎসব করেছিলাম নন্দনে। সেখানে বনশ্রীদিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন দেবকী বসুর পুত্র দেব কুমার বসু। নন্দনে এসে যখন দেখলেন আমিও সেই চলচ্চিত্র উৎসবের সঙ্গে যুক্ত, তখন খুব খুশি হলেন। আমাদের যে অনেকদিনের পরিচয়, সেটা আবার দেব কুমার বসুকে ডেকে বললেনও। অনুষ্ঠান শেষে আমাকে আলাদা করে ডেকে বলেছিলেন মায়ের ফোন নম্বরটা দিতে, কারণ কলকাতা দূরদর্শনে মায়ের প্রযোজিত সুরকার এবং গীতিকার প্রবীর মজুমদারকে নিয়ে একটা অনুষ্ঠান ওঁর ভীষণ ভাল লেগেছিল, সেটা উনি নিজে মুখে মাকে বলতে চেয়েছিলেন।

আমার দাদু কবি-গীতিকার অমিয় বাগচীর কথা শুনে উনি বেশ অবাক হয়ে যান, দাদুর লেখা আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া গানগুলো আবার নতুন করে শুনতে চাইলে আমি, ‘কথা কোয়োনাক শুধু শোনো’ শীর্ষক রেকর্ডটি ওঁকে উপহার দিই।
ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন আমাদের বাড়িতে আসার কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি। সাংবাদিকদের জীবন আমার মনে হয় ভীষণ নির্মম! এইসব শ্রদ্ধার, ভালবাসার মানুষদের চলে যাওয়ার পরে তাঁদের নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতেই সময় চলে যায়। নীরবে, নিভৃতে তাঁদের কথা এবং তাঁদের ঘিরে পুরোনো স্মৃতি ভাবার সময়টুকুও পাওয়া যায় না। এই লেখা লিখতে গিয়ে বারে-বারে বনশ্রীদির একটা গানের কথা খুব মনে হচ্ছে, ‘দূর আকাশে তোমার সুর খুঁজে পেলাম।’
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত