CCTV Short Story
(CCTV Short Story)

সমরেশের মনে হয়, পৃথিবীটা ধ্বংস হয়ে গেছে, মানুষ টের পাচ্ছে না।

সমরেশের কথায় তার বন্ধু, সহকর্মী বিজন বলে, তুমি কী করে টের পেলে বল দেখি।

সমরেশ বলল, তোমার কি মনে হয় সব ঠিক আছে?

বিজন বলল, ডিয়ার সমস, আমি ঠিক বুঝতে পারি না, এত যুদ্ধ চলছে, এত শান্তির কচকচি চলছে, অন্যায়ের বিপক্ষে এত বিক্ষোভ এত মিছিল, পৃথিবী ধ্বংস হলে তা হত?


আরও পড়ুন: তপ্ত মরসুম


– কত মানুষ যুদ্ধের পক্ষে, মৃত্যুর পক্ষে তা জানো মাই ডিয়ার পাণ্ডে।

বিজন পাণ্ডে বলল, কী জানি, পৃথিবী কত যুদ্ধ দেখেছে, পারমানবিক বোমাও পড়েছে পৃথিবীর উপর, তাতেও টিকে আছে, ধ্বংস হওয়া কি সোজা কথা? বিজন বলতে পেরে খুশি হল, মনে আসছিল না কীভাবে বোঝায় পৃথিবীকে।

তখন সমরেশ বলে, শোনো বন্ধু, পৃথিবী আর নেই, তুমি আমি সেই ধ্বংসস্তূপে বসে আছি।

বিজন বলল, তুমি বুঝিয়ে দাও ডিয়ার সমস।

CCTV Short Story
পৃথিবীটা ধ্বংস হয়ে গেছে, মানুষ টের পাচ্ছে না

সমরেশ বুঝিয়ে দিতে থাকে। বিজন মাথা নাড়তে থাকে। সমরেশ পাঁচটি মহাদেশের কথা বলে, সাতটি সাগরের কথা বলে, কত নদীর কথা বলে, পর্বতমালার কথা বলে, বিজন মন দিয়ে শুনতে থাকে। কিছু কিছু মন্তব্য করে। মন্তব্যগুলি এই রকম, আমরা তো সব দেখিনি, বুঝব কীভাবে, আছে কি ধ্বংস হয়ে গেছে? মরে যাওয়া আর ধ্বংস হয়ে যাওয়া কি এক? মরে যাওয়া কাকে বলে? ধ্বংস হয়ে গেলেও কি বেঁচে থাকে, আমরা সেখানে আছি কী করে?

সেই সময় সায়েবের খাস আর্দালি মালাকারবাবু এসে ডাকল, আপনাদের দু’জনকে স্যর ডাকছে?

সে ঠিক করেছে অন্তরা এবং সেই তারাপদর নাটকের অভিনয় যেদিন হবে, বড় সায়েবকে সে আমন্ত্রণ জানাবে। আমন্ত্রণ জানানোর সে কে? কেউ না। অন্তরা তার প্রাক্তন ছাড়া কিছুই নয়। অরূপ ঠিক করেছে সায়েবকে নিয়ে যাবে। টিকিটের দাম সে দেবে।

স্যর মানে বড় সায়েব। এই অফিসের কর্তা। সব অফিসের একজন হেড থাকে, ইনি হলেন সেই হেড। সমরেশ তাঁকে পছন্দ করে না। বিজনও। তারা বড় সায়েবের ধারে কাছে যেতে চায় না। বিকেলে অফিস শেষ হলে কেউ কেউ যায় তাঁর ঘরে, অনুমতি নিয়ে অফিস পরিত্যাগ করবে। বড় সায়েব অনেক সময় তাদের সঙ্গে তাদের কাজ নিয়ে আলাপ করেন। কতটা হল আর কতটা বাকি।

ওয়ার্ক ডায়েরি দ্যাখেন। তাতে কী হয়, মৃণালের সিনেমা দেখা হয় না। অরূপের থিয়েটার দেখাও বাতিল হয়। তাদের প্রেমিকারা তাদের জন্য অপেক্ষা করে ফেরত যায়।

অরূপের প্রেমিকা তাকে ছেড়ে থিয়েটারের এক দর্শকের হাত ধরে। অরূপ শুনেছে, তার প্রাক্তন অন্তরা শিগগির অভিনয়ে নামবে। একটা গ্রুপ থিয়েটারে যোগ দিয়েছে দু’জনেই। মানে সেই দর্শক তারাপদ এবং অন্তরা। এই ঘটনায় দুঃখ পেলেও অরূপ তার বড় সায়েবের সান্নিধ্য ত্যাগ করে না।

সে ঠিক করেছে অন্তরা এবং সেই তারাপদর নাটকের অভিনয় যেদিন হবে, বড় সায়েবকে সে আমন্ত্রণ জানাবে। আমন্ত্রণ জানানোর সে কে? কেউ না। অন্তরা তার প্রাক্তন ছাড়া কিছুই নয়। অরূপ ঠিক করেছে সায়েবকে নিয়ে যাবে। টিকিটের দাম সে দেবে।

এই কথা বিজন শুনেছে মৃণালের মুখে। মৃণালকে দুঃখের কথা বলেছে অরূপ। বিজনের মুখে তা শুনে সমরেশ বলল, বড় সায়েব নাটক বোঝে মনে হয়?

– বুঝতেও তো পারেন?

সে তো ইন্টারভ্যালে বেরোয় অনেকে, হাত পা ছাড়িয়ে নেয়, চা সিগারেট চলে, খিদে পেলে গাজর আলু সেদ্ধ করা ভেজিটেবল চপ, আধখানা ডিমের ডেভিল ইত্যাদি খায়, তারপর থার্ড বেল পড়ে, সকলে ছুটতে ছুটতে নিজের আসনে চলে আসে।

সমরেশ বলল, সম্প্রতি একটি নাটক দেখতে গিয়েছিলেন সায়েব, বিরতির সময় বাড়ি ফিরে এসেছিলেন।

– কে বলল?

– সি সি টিভি। সমরেশ নির্বিকার গলায় বলল, সি সি টিভির ফুটেজ চেক করলে দেখা যায় কে বেরিয়ে গেল, অথচ ঢুকল না।

পরীক্ষা করে দেখা হয়েছিল? বিজন জিজ্ঞেস করল।

– দরকার হয়নি, ফার্স্ট রো-র মাঝামাঝি সিট বিরতির পর ফাঁকা পড়ে রইল, তাতেই ধরা গিয়েছিল, সিটটা অন্ধকার হয়ে পড়েছিল, কেউ বসেনি, কিংবা ভূত বসেছিল, বুঝলে মাই ডিয়ার পাণ্ডে।

CCTV Short Story
সব অফিসের একজন হেড থাকে, ইনি হলেন সেই হেড

– আচ্ছা। মেনে নিল বিজন, তারপর জিজ্ঞেস করল, চলে এলেন কেন? ভাল লাগছিল না?

সমরেশ বলল, ভাল না লাগলেও লোকে পুরোটা দ্যাখে, অনেক নাটক ফার্স্ট হাফে জমে না, পরের হাফে বদলে যায়।

– নাটকের জন্য উনি বেরিয়ে আসেননি, তাহলে কেন? বিজন জিজ্ঞেস করল।

– উনি ভেবেছিলেন নাটক শেষ, সবাই হাততালি দিল, পর্দা পড়ে গেল, বেরিয়েও যাচ্ছে অনেকে।

– সে তো ইন্টারভ্যালে বেরোয় অনেকে, হাত পা ছাড়িয়ে নেয়, চা সিগারেট চলে, খিদে পেলে গাজর আলু সেদ্ধ করা ভেজিটেবল চপ, আধখানা ডিমের ডেভিল ইত্যাদি খায়, তারপর থার্ড বেল পড়ে, সকলে ছুটতে ছুটতে নিজের আসনে চলে আসে।

হ্যাঁ, তার পছন্দই ছিল তারাপদকে, মানে অভিনেতা তারাপদ মুৎসুদ্দিকে, সুযোগ খুঁজছিল কীভাবে অরূপকে ভাগিয়ে দেবে, মনে হয় বড় সায়েব তাকে সাহায্য করেছিলেন অরূপকে আটকে রেখে, এইটা যৌথ পরিকল্পনা হতে পারে।

– এ তো সাধারণ কথা, বড় সায়েব ভেবেছিলেন নাটক শেষ, আর কী, তাই বাড়ি ফিরে অফিসের কার পিছনে বাঁশ দেবেন, তা ভাবতে লাগলেন।

আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমস কাহিনির ডাঃ ওয়াটসনের মতো প্রশ্ন করে যাচ্ছিল বিজন পাণ্ডে। শান্ত মাথায় উত্তর দিতে লাগল সমরেশ-সমস। সমরেশ হোমস। বিজন জিজ্ঞেস করল, অরূপের বিচ্ছেদের কারণ তাহলে বড় সায়েব?

– বলতে পারো, আবার নাও পারো, সেই প্রেমিকা, কী নাম যেন?

বিজন বলল, অন্তরা তালুকদার।

– হ্যাঁ, তার পছন্দই ছিল তারাপদকে, মানে অভিনেতা তারাপদ মুৎসুদ্দিকে, সুযোগ খুঁজছিল কীভাবে অরূপকে ভাগিয়ে দেবে, মনে হয় বড় সায়েব তাকে সাহায্য করেছিলেন অরূপকে আটকে রেখে, এইটা যৌথ পরিকল্পনা হতে পারে।

বিজন জিজ্ঞেস করল, বড় সায়েব কি সেই প্রতিদানে তারাপদ আর অন্তরার অভিনয় দেখতে গিয়েছিলেন?

সমরেশ বলল, রাইট, তুমি ধরতে পেরেছ ঘটনাটা, এইবার বল বড় সায়েব যে অর্ধেক নাটক দেখে চলে এলেন, এইটা ফাঁস হল কী করে?

বিজন সিগারেট ধরিয়ে ডাঃ ওয়াটসনের মতো বলল, এইটা তারাপদ ফাঁস করে দিয়েছে, তাতে অন্তরার সায় ছিল মনে হয়।

– ঠিক, বিজন তুমি চমৎকার যুক্তির কথা বলতে পার, তাই-ই হয়েছিল।

তারা চলল। তাদের অন্যরা দেখল। এই অবেলায় সায়েব ডাকেন কেন? আজ সায়েবের লোকজন, মৃণাল এবং অরূপ আসেনি। মৃণাল গেছে গড়বেতা, আর অরূপের ছিল নাকি জ্বর। সমরেশ এবং বিজন ভিতরে ঢুকে গিয়েই বলল, আসব স্যর?

তখন মালাকারবাবু আবার এসে বলল, সায়েব ডাকছেন দু’জনকেই।

তারা চলল। তাদের অন্যরা দেখল। এই অবেলায় সায়েব ডাকেন কেন? আজ সায়েবের লোকজন, মৃণাল এবং অরূপ আসেনি। মৃণাল গেছে গড়বেতা, আর অরূপের ছিল নাকি জ্বর। সমরেশ এবং বিজন ভিতরে ঢুকে গিয়েই বলল, আসব স্যর?

সায়েব বলল, বসুন, আপনারা কত সময় ধরে অরূপ নিয়ে কথা বলছিলেন?

সমরেশ বলল, বলিনি স্যর, অরূপ নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই।

– আমি সি সি টিভিতে দেখছিলাম আপনারা গত আধ ঘণ্টা কথা বলে যাচ্ছিলেন।

– বলছিলাম স্যর, কাজ হয়ে গেছে তাই কাজের কথাই বলছিলাম।

বড় সায়েব বললেন, কাজের কথা? কী বলছিলেন?

সমরেশ বলল, আপনি কি টের পাচ্ছেন না?

– কী টের পাব, হড়পা বান? আচমকা কথাটা বেরিয়ে এল স্যারের মুখ দিয়ে।

– না স্যর?

– ভূমিকম্প?

– তাও না স্যর।

তবে কী? জিজ্ঞেস করল বড় সায়েব, বিশ্বের উষ্ণায়ন, নিকোবর দ্বীপের জঙ্গল কেটে ফেলা?

সমরেশ বলল, অরূপ নতুন প্রেমে পড়েছে, তাকে নিয়ে পরপর তিনদিন সিনেমা দেখেছে আইনক্সে, তিন দিনে তিনটি, কোনও সিনেমাই একদিনের বেশি চলে না।

সমরেশ বুদ্ধিমানের মতো প্রসঙ্গ বদলে দিল, বলল, অরূপ আসেনি কেন জানেন স্যর?

মাথা নাড়লেন সায়েব, বললেন, কী করে জানব?

সমরেশ বলল, অরূপ নতুন প্রেমে পড়েছে, তাকে নিয়ে পরপর তিনদিন সিনেমা দেখেছে আইনক্সে, তিন দিনে তিনটি, কোনও সিনেমাই একদিনের বেশি চলে না।

আপনাকে কে বলল? বড় সায়েব জিজ্ঞেস করলেন।

সমরেশ বলল, সি সি টিভি।

CCTV Short Story
অরূপের বিচ্ছেদের কারণ তাহলে বড় সায়েব?

বড় সায়েব চুপ। কী বলবেন বুঝতে পারছিলেন না। কিন্তু কথা তো বলতে হবেই। জিজ্ঞেস করলেন, ওদের সি সি টিভি খুব পাওয়ারফুল?

– হ্যাঁ স্যর, খুব।

বড় সায়েব বললেন, সরকার বলেছে ক্রমশ সবই সি সি টিভির আওতায় নিয়ে আসবে, এবং তা হচ্ছে। আমি ফুটেজ পেয়ে যাব।

– কবে বলল সরকার? সমরেশ জিজ্ঞেস করল।

বড় সায়েবের মনে হল এই দুই কর্মচারীও মিথ্যে বলছে। সি সি টিভির যুগে মিথ্যে চলে না, কিন্তু তা অগ্রাহ্য করছে। সব সি সি টিভিতে রেকর্ড হচ্ছে। এবং সর্বোচ্চ জায়গায় গিয়ে সঞ্চিত হচ্ছে।

– আপনি জানেন না?

– না তো, এমন কথা শুনিনি তো।

বড় সায়েব বলল, এইটা দু’বছরের প্রোগ্রাম, কিন্তু আগেই শেষ করতে হবে, আপনার না জানা থাকলে জেনে নিন। তারপর বড় সায়েব বললেন, অরূপ জানে না সে সি সি টিভির আওতায়, মিথ্যে অজুহাত ধরা পড়ে যাবে।

সমরেশ বলল, ফোন করলেই হয় স্যর।

স্যর গম্ভীর মুখে মাথা নাড়লেন। ফোন অরূপ বা মৃণাল করবে, তিনি হেড, তিনি করতে পারেন না। এতে তিনি নিয়ন্ত্রণ হারাবেন। কবে জয়েন করবে? জিজ্ঞেস করলেন বড় সায়েব।

বিজন বলল, সি সি টিভি জানবে, তাই তো সমরেশ?

– সি সি টিভির কী ভবিষ্যৎ জানা থাকে? সমরেশ জিজ্ঞেস করল।

বড় সায়েবের মনে হল এই দুই কর্মচারীও মিথ্যে বলছে। সি সি টিভির যুগে মিথ্যে চলে না, কিন্তু তা অগ্রাহ্য করছে। সব সি সি টিভিতে রেকর্ড হচ্ছে। এবং সর্বোচ্চ জায়গায় গিয়ে সঞ্চিত হচ্ছে।

সায়েব বললেন, তিনি চেক করবেন ফুটেজ। ধরা যাবে অরূপ কোথায়, মৃণাল কোথায়।

আর কিছু সময় স্যারের সঙ্গে কথা বলে তারা ফিরে এল। স্যর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছিলেন। আসলে তিনি এতদিন বাদে অরূপ এবং মৃণালকে দেখতে পাচ্ছেন না সি সি টিভিতে। সমরেশ মানে সমস, হোমস মৃণাল আর অরূপের মতো নিরীহ মক্কেল নয়। হোমস বা সমস সব খোঁজ রাখে। সিনেমা দেখার কথা মনে হয় সত্যি নয়।

হ্যাঁ, মৃণালও এসেছিল সঙ্গে, মৃণাল বলল, তার কোনও প্রেম হয়নি, প্রেম করলেই স্যারের আওতায়, মানে সি সি টিভি, চন্দ্রচূড় তরফদার ভৌমিকের নজরে এসে যাবে, তাই।

দুই

অফিস থেকে বেরিয়ে বিজন আর সমরেশ হাঁটছিল। মস্ত অফিস এলাকা সারাদিন গমগম করে। বিকেল হতে হতে ঘুমের আয়োজন শুরু হয়ে যায়। বিজন বলল, তুমি যে বলছ, সব সি সি টিভির আওতায়, তার মানে আমরাও?

সমরেশ বলল, নিশ্চয়।

– অরূপ কি তোমার বাড়ি গিয়েছিল বেকার স্ট্রিট মানে বাকের আলি এভিনিউ?

– হ্যাঁ, বলল, তার দু’টো প্রেম স্যারের জন্য ভেঙে গেছে, এইটা সে হারাতে চায় না।

– তোমার কাছে পরামর্শ চাইল?

CCTV Short Story
বড় সায়েব কি সেই প্রতিদানে তারাপদ আর অন্তরার অভিনয় দেখতে গিয়েছিলেন?

– হ্যাঁ, মৃণালও এসেছিল সঙ্গে, মৃণাল বলল, তার কোনও প্রেম হয়নি, প্রেম করলেই স্যারের আওতায়, মানে সি সি টিভি, চন্দ্রচূড় তরফদার ভৌমিকের নজরে এসে যাবে, তাই।

বিজন বলল, মিথ্যে বলতে পারে না?

সমরেশ বলল, মিথ্যে বলা বারণ, বলেছে সি সি টিভি ধরে ফেলবে কথা সত্যি না মিথ্যে।

– সে কী! মিথ্যে বলা আমার মৌলিক অধিকারের ভিতর পড়ে সমরেশ।

– না পড়ে না, দেখছ না কোথাও মিথ্যে তথ্য ভরতে গেলেই রিফিউজ করে, তখন গ্যাস বন্ধ, ফোন বন্ধ, রেশন বন্ধ, ভাতা বন্ধ, হৃদযন্ত্রই প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তো। ভুল করলে খেসারত না দিয়ে পার পাবে?

হ্যাঁ বিজন, যখন দরকার পড়বে দেখিয়ে দেবে আমরা বাড়ি না গিয়ে ময়দানে বসেছি, বসে সি সি টিভির বিপক্ষে কথা বলেছি, আমাদের সব তথ্য আগেই নেওয়া হয়ে গেছে, আবার নেবে, ভেরিফাই করবে, তারপর সি সি টিভির ফুটেজ দেখবে

বিজন বলল, কিন্তু ক্রমাগত মিথ্যে কি কেউ বলছে না?

– তাদের সে অধিকার আছে।

বিজন বলল, কেমন ভাবে আছে, বুঝিয়ে দাও তো।

সমরেশ বলল, সি সি টিভি বন্ধ রেখে তখন কাজটা করে নেয় কেউ কেউ।

– কী কাজ?

– বিলেতে পালিয়ে গেল হাজার কোটি টাকা ঋণ রেখে, কিংবা খুন করেও দিবালোকে ঘুরে বেড়ায়, পুলিশ চিনেও চিনতে পারে না, তখন সি সি টিভি বন্ধই থাকে বিজন।

তারা হাঁটতে হাঁটতে ধর্মতলায়। এখান থেকে যে যার বাস ধরবে। বিজন বলল, চল মনুমেন্টের নিচে বসি।

সন্ধে হয়ে গেছে। সমরেশ আর বিজন ময়দানে বসল মুখোমুখি। বিজন জিজ্ঞেস করল, আমরা কি এখন সি সি টিভির আওতায় আছি?

– হ্যাঁ বিজন, যখন দরকার পড়বে দেখিয়ে দেবে আমরা বাড়ি না গিয়ে ময়দানে বসেছি, বসে সি সি টিভির বিপক্ষে কথা বলেছি, আমাদের সব তথ্য আগেই নেওয়া হয়ে গেছে, আবার নেবে, ভেরিফাই করবে, তারপর সি সি টিভির ফুটেজ দেখবে, স্যরেরও রেহাই নেই, উনি আমাদের ফুটেজ সেভ করছেন, ওঁর ফুটেজ সেভ করছে অন্য কেউ, যেমন বিরতির সময় বেরিয়ে এসেছিলেন নাটক সম্পূর্ণ না দেখে, তা কেমন ফাঁস করে দিল।

অরূপ কিছুই বলল না। মালাকারবাবু বেলায় ডাকল অরূপ আর মৃণালকে। মৃণাল আর অরূপ গেল, ফিরতে তাদের সময় লাগছে। বিজন আর সমরেশ অপেক্ষা করছে।

– ফাঁস করল কেন, তোমার কী মনে হয়?

সমরেশ বলল, স্যরকে জানিয়ে দিল তাঁর সব ফুটেজ তাদের কাছে আছে।

বিজন বলল, স্যর কি তা জানতেন না?

– জানতেন, কিন্তু বিশ্বাস করতেন না, ক্ষমতা হাতে থাকলে এক সময় মনে হয়, তিনিই সর্বশক্তিমান, আসলে তা নয় যে, তা সি সি টিভি জানিয়ে দিল।

বিজন আর সমরেশ উঠল। রাত আটটার পর পুলিশ আর বসতে দেয় না। পাহারাওয়ালা ঘোরে, মস্তানরা টর্চ মেরে দেখে যুগলে আছে কি না, মানে লেডিজ সমেত জেন্টস। তারা হাঁটতে হাঁটতে বাসের জন্য দাঁড়াল স্টপেজে। দু’জনে দুদিকে যাবে। একজন হাওড়া, অন্যজন শ্যামবাজার।

CCTV Short Story
মাথা খাটাও বিজন, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার প্রধান লক্ষণ হল সি সি টিভি অকেজো হয়ে যাওয়া

পরদিন মৃণাল, অরূপ জয়েন করল। মৃণাল বলল, সে গড়বেতা গিয়েছিল, শালীর বিয়ে ছিল।

অরূপ কিছুই বলল না। মালাকারবাবু বেলায় ডাকল অরূপ আর মৃণালকে। মৃণাল আর অরূপ গেল, ফিরতে তাদের সময় লাগছে। বিজন আর সমরেশ অপেক্ষা করছে। দু’জনেই পারমিশন না নিয়ে এক সপ্তাহ অনুপস্থিত। এইটা ঠিক হয়নি। এতে সার্ভিস ব্রেক হতে পারে, তাতে সাত দিনের বেতন কাটা যেতে পারে। কত কিছু হতে পারে। বিজন বলল, তাতেও তো ওরা কোনও কিছুই লুকোতে পারেনি।

– পেরেছে, দু’জনে বেড়াতে গিয়েছিল সমুদ্রতীরে, মদ খেয়েছে আর সমুদ্র স্নান করেছে।

সমরেশ হেসে বলল, মাথা খাটাও বিজন, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার প্রধান লক্ষণ হল সি সি টিভি অকেজো হয়ে যাওয়া। মাথা নাড়তে লাগল বিজন, বলল, তুমি হেরে গেলে মাই ডিয়ার হোমস।

– কে বলল?

– অরূপ।

– সি সি টিভি?

– যা হয় হবে। অরূপ বলল।

বিজন জিজ্ঞেস করল, কখন বলল?

– রাত্রে ফোন করে।

বিজন বলল, তার মানে সি সি টিভি কোনও কাজের না?

– তাই তো দেখছি।

সেই লোকটা, খুনে অভিযুক্ত অফিসার বেতন নিচ্ছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রকাশ্য দিবালোকে, তার কিছুই হচ্ছে না তো।

– কেন সমরেশ?

– পৃথিবীটা ক্রমাগত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, আমরা টের পাচ্ছি না বিজন।

– ধ্বংস হওয়ার চিহ্ন কী? অজিতের মতো বিজন জিজ্ঞেস করল হোমস-সমস অর্থাৎ সমরেশকে।

সমরেশ হেসে বলল, মাথা খাটাও বিজন, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার প্রধান লক্ষণ হল সি সি টিভি অকেজো হয়ে যাওয়া।

মাথা নাড়তে লাগল বিজন, বলল, তুমি হেরে গেলে মাই ডিয়ার হোমস, এর অর্থ ধ্বংসস্তূপে আলো, বেঁচে ওঠা, বুঝেছ ডিটেকটিভ মশায়।

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Please login to bookmark Close
Picture of অমর মিত্র

অমর মিত্র

অমর মিত্রের জন্ম ১৯৫১ সালে বসিরহাটে। তবে বহুদিন কলকাতাবাসী। ১৯৭৪ সালে 'মেলার দিকে ঘর' গল্প লিখে সাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। প্রথম উপন্যাস 'নদীর মানুষ' ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয় অমৃত পত্রিকায়। প্রথম গল্পের বই 'মাঠ ভাঙে কালপুরুষ'-ও ওই সালেই। রাজ্য সরকারি চাকরি করেও আজীবন সাহিত্যসাধনায় ব্রতী। ২০০৬ সালে 'ধ্রুবপুত্র' উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। ২০০১ সালে বঙ্কিম পুরস্কার পান 'অশ্বচরিত' উপন্যাসের জন্য। ২০২২ সালে গাঁওবুড়ো গল্পের ইংরেজি অনুবাদ প্রথম এশিয়ান লেখক হিসেবে ও হেনরি পুরস্কার। ২০০৪ সালে সম্মানিত হন শরৎ পুরস্কারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Please login to bookmark Close

The Banglalive's Picks

Weekly Newsletter

Enjoy our flagship newsletter as a digest delivered once a week.

By signing up, you agree to our User Agreement and Privacy Policy & Cookie Statement.

Please login to bookmark Close
প্রতি রাতে, দরজার ওপাশ থেকে নির্মলেন্দু একটা শব্দ শোনেন— মাটির টবে জল পড়ার টুপটাপ শব্দ; ঠিক যেন কারও নিঃশ্বাসের ছন্দ! অথচ বহুকাল ঘরটায় কোনও জানলাই খোলা থাকে না। বালিগঞ্জে রেললাইনের ধারে এই আধভাঙা রায়বাড়ির পিছনের ঘরটায় সূর্য ঢোকেনি অনেকদিন। আজকের ছোট গল্প 'তবুও ফুল ফোটে'। লিখছেন প্রান্তিক বিশ্বাস...
Please login to bookmark Close
সকাল সকাল সকলে মিলে আবার গেল বিশ্বনাথের মন্দিরে পুজো দিতে। আজ শ্রাবণ মাসের প্রথম সোমবার। তাই গিজগিজ করছে লোক। মাইকে অনবরত ঘোষণা করছে, ‘ওমুক তিওয়ারি, তমুক সিং - আপকা ঘরওয়ালে আপকে লিয়ে মন্দির অফিস মে ইনতেজার কর রহে হে, আপ যাহা পে ভি হ্যায়, তুরন্ত মন্দির অফিস মে আকর মুলাকাত কিজিয়ে।’ পড়ুন 'কর্পূর ও মহাকাল' গল্পের ২য় পর্ব। লিখছেন মোহনা মজুমদার...
Please login to bookmark Close
"রাম নাম সত্য হে, রাম নাম সত্য হে" আওড়াতে আওড়াতে কয়েকজন লোক মৃতদেহটি নিয়েঘাটের দিকে এগিয়ে চলল। হলুদ কাপড় আর লাল চেলিতে পুরো দেহটি মোড়া। দালানে বসে এক অঘোরী বাবা "হর হর মহাদেব" বলতে বলতে হুঁকো টানছে। চারিদিকে সাদা ধোঁয়া আর মরা পোড়ার গন্ধে ছেয়ে গেছে। কাদা আর গোবরে সরু সরু গলিগুলো যেন নিজেদের সাজিয়ে রেখেছে। কারওর কোনও আক্ষেপ নেই, বিরক্তি নেই, ঘেন্না নেই। লিখছেন মোহনা মজুমদার...

Subscribe

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com