(Raghunath Goswami)
রঘুনাথ গোস্বামী নামটির সঙ্গে জুড়ে রয়েছে বিজ্ঞাপন জগৎ, পাপেট শিল্প, চিত্রকলা ইত্যাদি। ইংরেজিতে যাকে বলে প্লেসেন্ট পার্সোনালিটি, রঘুনাথদা ছিলেন তাই। রঘুনাথ গোস্বামীর শিল্পীসত্তার ব্যাপ্তি বিস্মৃত। কিন্তু যে বিষয়টি অবাক করে, সেটি হল তাঁর কোনও প্রথাগত শিক্ষা ছিল না চিত্রকলায়! রঘুনাথদার পৈতৃক নিবাস ছিল হুগলি জেলার শ্রীরামপুরে, কিন্তু শুনেছি তাঁর জন্ম হাওড়ার সাঁতরাগাছিতে, ১৯৩১ সালে। জে.ওয়াল্টার টমসনের ক্রিয়েটিভ আর্ট ডিরেক্টর পদে কাজ করেছিলেন অনেক বছর। একদম অল্প বয়স থেকেই নাকি পাইকপাড়ার রানি হর্ষমুখী রোডের একটি একতলা ভাড়াবাড়িতে গুটিকয়েক ছাত্রকে ছবি আঁকা শেখাতেন।
আরও পড়ুন: স্মৃতির আকাশ থেকে (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯), (১০), (১১), (১২), (১৩), (১৪), (১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯), (২০), (২১), (২২), (২৩), (২৪), (২৫), (২৬), (২৭), (২৮), (২৯), (৩০), (৩১), (৩২), (৩৩), (৩৪), (৩৫), (৩৬), (৩৭), (৩৮), (৩৯), (৪০), (৪১), (৪২), (৪৩), (৪৪)
রঘুনাথ গোস্বামী সম্পর্কে ছিলেন আমার দিদিমা মলিনা বাগচীর মামা। ছোটবেলা থেকে মামাবাড়িতে রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন দেখতাম হাতে আঁকা একটা রবীন্দ্রনাথের ছবি; রজনীগন্ধা, বেলফুল আর জুঁইফুলের মালা দিয়ে সাজানো। পরে মায়ের মুখে শুনেছিলাম, ওই ছবিটা মাত্র ৮ বছর বয়সে রঘুনাথদার আঁকা। ছবিটা এঁকে উপহার দিয়েছিলেন আমার দাদু রবীন্দ্র অনুরাগী কবি-গীতিকার অমিয় বাগচীকে।
পরবর্তীকালে ওই ২৫শে বৈশাখের অনুষ্ঠানে কেশবচন্দ্র সেন স্ট্রিটের বাড়িতেই রঘুনাথদাকে প্রথম দেখি, সঙ্গে করে রবীন্দ্রনাথের অনেকগুলো অ-দেখা ছবি নিয়ে এসেছিলেন। সেদিন প্রতিটি ছবির সঙ্গে জড়িত ইতিহাসের কথা বলেছিলেন। পরপর অনেকগুলো বছর উনি ২৫শে বৈশাখ মামাবাড়িতে আসতেন। কোন সাল মনে নেই, সেবার ২৫শে বৈশাখে খুব বৃষ্টি হয়েছিল। যাঁরা মধ্য বা উত্তর কলকাতায় থাকেন তাঁদের নিশ্চয়ই ধারণা রয়েছে সামান্যতম বৃষ্টি হলেও সেখানে কী পরিমাণ জল জমে রাস্তায়!

কবির জন্মদিনে সেদিনের বৃষ্টিতে কেশবচন্দ্র সেন স্ট্রিটে এক হাঁটু জল, তার মধ্যেও রঘুনাথদা সস্ত্রীক এসেছিলেন রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে, সঙ্গে ওঁর সহকর্মীরাও ছিলেন! আমার কেন জানি না রঘুনাথদাকে দেখে মনে হত, উনি প্রকৃত অর্থেই রাবীন্দ্রিক ঘরানার মানুষ। ভীষণ ভাল লাগত ওঁর সান্নিধ্য, বাচনভঙ্গি ও ব্যক্তিত্ব। আর ওঁর কথা শুনে যে সমৃদ্ধ হতাম, তা বলাই বাহুল্য।
একবার রঘুনাথদা আমার আগ্রহ দেখে ওঁর দমদম কাজীপাড়ার বাড়িতে আমাদের ডাকলেন। আমরা মানে বাবা-মা আর আমি। সেই বাড়ির ছোট্ট বসবার ঘরটির চারদিকে নান্দনিকতার নিদর্শন। অন্য একটা ঘরের এক কোণে একটা পিয়ানো। সারাদিন নানা গল্প আর ওঁর বৈচিত্রময় অভিজ্ঞতা যেন এক অন্য জগতে নিয়ে গিয়েছিল আমাকে! ওঁর সংগ্রহে থাকা বেশ কিছু লং প্লে রেকর্ড বাজিয়ে শুনিয়েছিলেন। তার মধ্যে ‘মীরা’ ছবির বিভিন্ন গান শুনেছিলাম। গুলজার পরিচালিত ‘মীরা’ ছবির সবকটা গানের সুর করেছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর।

দুপুরের খাওয়ার পর্ব চুকলে, আমাদের অন্য ঘরটায় ডেকে বসালেন। তারপর নিজে গিয়ে বসলেন পিয়ানোর সামনে। পিয়ানোর ঢাকনা খুলে আঙুল রাখলেন রঘুনাথদা, আর আমরা একে একে শুনলাম, ‘কতবারও ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া’, ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’ ইত্যাদি। পুরো দিন কেটে গিয়েছিল গানে, গল্পে আর যন্ত্রসঙ্গীতের সুরমূর্ছনায়। ফেরার সময় বললেন, ‘কিরণ শঙ্কর রায় রোডে আমার অফিস, ৮ নম্বর বাড়ির একতলায়, দরজায় লেখা রয়েছে R. Goswomi & associates, যখনই ইচ্ছে হবে চলে এস।’

শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, সব ঋতুতেই সপ্তাহে একদিন চলে যেতাম রঘুনাথদার অফিসে। হাসিমুখে আমায় বসতে বলে ওঁর স্ত্রী ভবানীদি ওঁকে ডেকে আনতেন। তখন ওঁর মুখে অন্নদা মুন্সী, সত্যজিৎ রায়, রনেন আয়ান দত্ত প্রমুখের নানা কথা শুনতাম। একবার বললেন, ‘জানো, মানিকবাবুর জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানিয়ে চিঠি দিলাম। তবে গতানুগতিক ভাষা এড়িয়ে লিখলাম, “প্রতি বছর ২রা মে আসে, আর আপনি এক বছর করে নিজের বয়সটা বাড়িয়ে নেন, এটা কি ঠিক কাজ করছেন?” সেই মজার চিঠি পেয়ে সত্যজিৎ রায় আরও কৌতুক করে রঘুনাথদার চিঠির উত্তর দিয়েছিলেন।
আমরা কন্যাকুমারী বেড়াতে যাব শুনে উনি জানিয়েছিলেন, ওখানকার বিবেকানন্দপুরমের দেওয়ালে ওঁর অনেক কাজ রয়েছে, চাইলে গিয়ে দেখতে পারি। আর যদি ওখানে থাকতে চাই, উনি সেখানকার আধিকারিককে চিঠি লিখে দেবেন। ওঁর অফিসে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই মাকে একটা করে চিঠি লিখতেন উনি। চিঠিতে আমার সঙ্গে ওঁর কী কী বিষয়ে গল্প হত, সব জানাতেন।

চিঠির মধ্যে আমার সম্পর্কে কিঞ্চিৎ প্রশংসাও থাকত বলে শুনেছি মায়ের কাছে! একবার বললেন, মুর্শিদাবাদ যাচ্ছেন বেশি সংখ্যক ঢাকি জোগাড় করতে, কারণ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর উদ্যোগে ফ্রান্সে আয়োজিত ভারত উৎসবে তাঁদের নিয়ে যাবেন। আমি শুনে বলেছিলাম, একেবারে মুর্শিদাবাদ থেকে প্যারি শহর!
যখনই ওঁর কাছে যেতাম, দেখতাম মুখে একটা মিষ্টি হাসি লেগেই আছে। রঘুনাথদা যে কত বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন, তার হিসেব করা কঠিন! শুধু কি বই! নানা কোম্পানির বর্ষপঞ্জির অলংকরণও করেছেন। তার কিছু কিছু নমুনা ওঁর বাড়িতে গেলে দেখাতেন। ততদিনে রঘুনাথদারা দমদম কাজীপাড়া ছেড়ে দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত পাড়া ম্যান্ডেভিলা গার্ডেন্সের ফ্ল্যাটে চলে এসেছিলেন। সেই ফ্ল্যাটের বসবার ঘরও নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সাজিয়েছিলেন। কোথাও পুরুলিয়ার ছৌ নাচের মুখোশ, তো কোথাও আবার পাপেটে ব্যবহৃত পুতুল। বারান্দায় বাঁকুড়ার মৃৎশিল্প।

ওঁর উল্টো দিকের ফ্ল্যাটে থাকতেন রাধাপ্রসাদ গুপ্ত। মাঝে মধ্যে উনিও এসে রঘুনাথদার বসবার ঘর আলো করে গল্পে যোগ দিতেন! মাত্র ৬৪ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে রঘুনাথদা শিল্পকলার জগতে যে অবদান রেখে গেছেন, এক কথায় তা তুলনাহীন এবং বৈচিত্রময়! রাষ্ট্রপতি রাধাকৃষ্ণন, পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন রাজ্যপাল রঘুনাথ রেড্ডি প্রমুখের হাত থেকে পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার। প্রধানমন্ত্রী নেহেরু এবং ইন্দিরা গান্ধী তাঁর শিল্পকর্ম দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু এইসব নিয়ে কোনও অহংবোধ রঘুনাথদার মধ্যে ছিল না।
শিল্পকর্মের পাশাপাশি নির্মাণ করেছিলেন বেশ কয়েকটি তথ্যচিত্র। সাহিত্যজগতের সঙ্গেও রঘুনাথদার নিবিড় যোগাযোগ ছিল। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমথনাথ বিশী, কবিশেখর কালিদাস রায়, মুজতবা আলি, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখের সঙ্গে তাঁর ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ভীষণ ভক্ত ছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ‘ইছামতী’র প্রচ্ছদ আঁকার আগে বিভূতিভূষণের আমন্ত্রণে রঘুনাথদা নদীর রূপ দেখে আসেন। বিভূতিভূষণ যখন ঘাটশিলায় থাকতেন, তখন বেশ কয়েকবার রঘুনাথদা সেখানে গিয়ে থেকেছেনও। প্রণম্য সাহিত্যিকের সঙ্গে বনেবাদাড়েও ঘুরতেন।

পাপেট শিল্পে ‘হট্টগোল বিজয় পালা’ উপস্থাপন করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন! এত অল্প সময়ের মধ্যে কীভাবে একজন মানুষ সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারায় এতরকম কাজ করে গিয়েছেন, ভাবলে অবাক লাগে! কাজের নেশা ছাড়াও তাঁর ছিল আরেকটা নেশা, সেটা হল ধূমপান। মাঝখানে সেটা বেশ বেড়ে গিয়েছিল। প্রথম যখন হৃদরোগে আক্রান্ত হন, সেবার কোনওরকমে সামলে উঠেছিলেন, কিন্তু দ্বিতীয়বার হার মানতে হল। মায়ের সঙ্গে রঘুনাথদার বিষয়ে মাঝে মধ্যেই কথা হত। মায়ের ভীষণ ইচ্ছে ছিল রঘুনাথদাকে নিয়ে একটা তথ্যচিত্র তৈরি করার। আশা রাখি, সেই অসমাপ্ত কাজটা আগামী দিনে শেষ করতে পারব।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত