(Jogen Choudhury Obituary)
যোগেনদার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ট্রেনে। শীর্ষেন্দুদা মানে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় যোগেনদার সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দেন শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসে। সালটা সম্ভবত ২০১১। রবীন্দ্রনাথের জন্মসার্ধশতবর্ষে তপন সিংহ ফাউন্ডেশন আর বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবন যৌথভাবে রবীন্দ্ররচনাভিত্তিক চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করল। অগাস্ট মাসে শান্তিনিকেতনের লিপিকা প্রেক্ষাগৃহে আমরা তিনদিনের জন্য এই আয়োজন করেছিলাম। কলকাতায় ফেরার সময় এই পরিচয়পর্ব।
আরও পড়ুন: স্মৃতির আকাশ থেকে (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯), (১০), (১১), (১২), (১৩), (১৪), (১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯), (২০), (২১), (২২), (২৩), (২৪), (২৫), (২৬), (২৭), (২৮), (২৯), (৩০), (৩১), (৩২), (৩৩), (৩৪), (৩৫), (৩৬), (৩৭), (৩৮), (৩৯), (৪০), (৪১), (৪২), (৪৩), (৪৪), (৪৫), (৪৬), (৪৭), (৪৮), (৪৯)
হাওড়া স্টেশনে নামার পরে, মনে আছে, যোগেনদা জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি হাওড়া থেকে কীভাবে বাড়ি ফিরব। আমি ঠিক করেছিলাম, একটা ট্যাক্সি নিয়ে শীর্ষেন্দুদাকে ওঁর যোধপুর পার্কের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে বাড়ি চলে আসব।
সেই পরিকল্পনা যোগেনদাকে জানাতে উনি বললেন, ‘তার কোনও দরকার নেই, আমার গাড়ি আসছে, সেই গাড়িতে তোমরাও উঠে পড়ো। আমি তোমাকে প্রথমে নামিয়ে তারপর শীর্ষেন্দুদাকে নামিয়ে বাড়ি চলে যাব।’ সেইদিনই জেনেছিলাম যে উনি সাউথ সিটির ফ্ল্যাটে থাকেন।



এর কয়েক মাস পরে একদিন আমার বাড়িতে আসা একজন অতিথিকে বাড়ির নিচ পর্যন্ত পৌঁছতে গিয়ে দেখি রাস্তার উল্টোদিকে যোগেনদা দাঁড়িয়ে! আমাকে দেখে বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুমি কি এখানেই থাকো?’ আমি বললাম, ‘এটাই তো আমাদের পৈতৃকবাড়ি।’
যোগেনদা তখন জানালেন, ওঁর এক বন্ধু ওঁকে নিয়ে একটা বই লিখছেন, তাই এই বাড়িটা বন্ধুকে দেখাতে নিয়ে এসেছেন। আসার কারণ ওপার বাংলার থেকে যোগেনদার পরিবার যখন এপার বাংলায় চলে আসে, তখন আমাদের বাড়ির একতলায় এসে তাঁর পরিবার উঠেছিল।



আসলে আমাদের বাড়িটা এক সময় পুলিশ ব্যারাক ছিল, আর যোগেনদার জ্যাঠামশাই ছিলেন আইবির একজন অফিসার। পরে বাবা-মার কাছে শুনেছিলাম আমার দাদু অপূর্ব কুমার মৈত্রও ছিলেন পুলিশ আধিকারিক।
যখন উনি শুনলেন আমাদের বাড়ি, তখন বললেন, ‘তাহলে বাড়ির ভেতরে কি একবার যাওয়া যাবে?’ আমি খুব খুশি হয়েই বললাম, ‘অবশ্যই যাওয়া যাবে, আপনি আমাদের বাড়িতে যাবেন, সেটা তো আমাদের সৌভাগ্য!’

বাড়ির একতলায় ওঁরা থাকতেন। উনি সেই একতলায় ঢুকেই বললেন ‘আমার প্রথম ছবি আঁকা এই বাড়ির দেয়ালে, একটা ময়ূর এঁকেছিলাম।’ আমার প্রাক্তন স্ত্রী যোগেনদা এসেছেন শুনে ওপর থেকে তরমুজের শরবত করে এনে ওঁকে ও ওঁর বন্ধুকে দিল। সময়টা ছিল গ্রীষ্মকাল আর তারিখটা ছিল ২১ এপ্রিল।
সেদিন দেখেছিলাম, উনি ভীষণভাবে নস্টালজিক হয়ে পড়েছিলেন! আমাকে অনেক কথা জিজ্ঞাসা করছিলেন। এখনও বাড়ির পাশে সংঘ শক্তি ক্লাবের দুর্গাপুজো হয় কি না, আর মাঠের পাশে নরেশ সেনগুপ্তদের বাড়িটা আছে কি না, বাড়ির বাঁদিকে থাকা একটা পুরোনো বাড়িতে যে শিখ পরিবারটা থাকত, তাদের খবর কী ইত্যাদি ইত্যাদি। সংঘ শক্তি ক্লাবের কথা উঠতেই বললেন, ‘জানো, এই ক্লাবের পুজোতেই আমি প্রথম হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান শুনি, আর সেই গানটা ছিল, “গাঁয়ের বধূ”। আর সেই সঙ্গে শতরঞ্চির ওপর বসে সিনেমাও দেখেছি। ছবির নাম ছিল “তানসেন”, সেই ছবিতে সায়গল অভিনয় করেছিলেন।’



সেদিন বাড়ির চারপাশে ঘুরে অনেক ছবি তুলেছিলেন ওঁর মুঠোফোনে। আমাদের মনোহরপুকুরের বাড়ি নিয়ে ওঁর একটা আলাদা আবেগ ছিল। বর্তমানে আমাদের বাড়ির ঠিকানা ২২/২৩এ, মনোহরপুকুর রোড, আর অতীতে বাড়ির ঠিকানা ছিল P-৯৫ ব মনোহরপুকুর রোড। এ কথা যোগেনদার কাছেই শোনা। উনি বলেছিলেন যে বাড়ির অভিভাবকরা ওঁদের ভাই-বোনকে ঠিকানাটা মুখস্থ করিয়ে দেন। কারণ বাচ্চারা যদি হারিয়ে যায়, তাহলে ঠিকানাটা বলতে পারলে হয়তো কেউ সাহায্য করতে পারবে।
এরপর অনেকদিন কেটে গিয়েছে। যোগেনদার সঙ্গে কয়েকটি অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছে আর ফোনে মাত্র বারচারেক কথা হয়েছে। এসবের মাঝে এল করোনাকাল, বিশ্ব সংসার স্তব্ধ হয়ে গেল! মানবসভ্যতা গৃহবন্দি। সেই সময় আমি যে সংবাদপত্রে কর্মরত ছিলাম, তাদের পুজোসংখ্যায় কর্তৃপক্ষ যোগেনদার একটা ছবি ছাপার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। সেই কথা যোগেনদাকে জানাতে উনি চারুবাসনায় যেতে বললেন।
মজার ব্যাপার হল ছোঁয়াচে রোগের মতো শিল্পীদের সান্নিধ্যে নিয়মিত থাকতে থাকতে আমাকেও ছবি আঁকায় পেয়ে বসল! প্রথাগত ছবি আঁকার কোনও শিক্ষা আমার নেই, কিন্তু আরেক প্রবাদপ্রতিম চিত্রকর সনৎ করের ছবি দেখে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম।
দিনটা ছিল ২০২০ সালের ১ অক্টোবর। প্রায় সেই বছর থেকেই চারুবাসনায় নিয়মিত যাওয়া শুরু হল। একদিন যোগেনদা আমাকে ডেকে বললেন, ‘আমরা ঠিক করেছি তোমাকে আমাদের সেন্টারের সাংস্কৃতিক কাজে যুক্ত করব। তুমি এবার থেকে কিন্তু নিয়মিত আসবে।’
এর বছরখানেকের মধ্যে সংবাদপত্রের চাকরি থেকে ইস্তফা দিলাম। হাতে অফুরন্ত সময়। সারা বছর ধরে চারুবাসনার উপেন্দ্রকিশোর সভাঘরে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতাম। আমার প্রতিটি কাজে যে ওঁর প্রশ্রয় থাকত, এ কথা বলাই বাহুল্য।



মজার ব্যাপার হল ছোঁয়াচে রোগের মতো শিল্পীদের সান্নিধ্যে নিয়মিত থাকতে থাকতে আমাকেও ছবি আঁকায় পেয়ে বসল! প্রথাগত ছবি আঁকার কোনও শিক্ষা আমার নেই, কিন্তু আরেক প্রবাদপ্রতিম চিত্রকর সনৎ করের ছবি দেখে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম।
আমার ছবি আঁকার বিষয়টি জানার পরে যোগেনদা উৎসাহ দিতে শুরু করলেন। বলেছিলেন, ‘আমি তোমাকে শেখাবো না, কারণ তোমার নিজস্বতা তাহলে তৈরি হবে না।’ নতুন কী আঁকলাম, জানতে চাইতেন সব সময়। শুধু জানা নয়, ছবিগুলো দেখতেও চাইতেন। বেশ কিছু ছবি দেখে বলেছিলেন, ‘তুমি জার্মান চিত্রকর পল ক্লি-র কাজ ভাল করে স্টাডি করো, অনেক কিছু শিখতে পারবে।’
গত দশ বছরে খুব কাছ থেকে যোগেনদার মধ্যে একজন সুভদ্র, সংবেদনশীল মনের মানুষকে আবিষ্কার করেছি। নীরবে কত মানুষের পাশে যে দাঁড়িয়েছেন, সেটা কাছে না গেলে বুঝতেই পারতাম না।
সেন্টারে কোনও ছবি দেখাতে গেলে, সেগুলো আবার অন্য কয়েকজনকে দেখিয়ে বলতেন, ‘দেখ, অরিজিতের হাতে স্পিড চলে এসেছে।’ অনেক গ্ৰুপ শো-তে আমার ছবি রাখতেন, বিশেষ করে চারুবাসনা যেগুলো আয়োজন করত। অনেক গ্ৰুপ শো-তে ওঁর ছবির সঙ্গে আমার ছবির সহবস্থান দেখে নিজেই অবাক হয়েছি!
কত নতুন শিল্পীদের ছবি কিনে যে উৎসাহ দিতেন, তা হিসেব করে বলা যাবে না! তাই নবাগত এবং তরুণ প্রজন্মের শিল্পীরা সাহস করে, নির্দ্বিধায় যোগেনদাকে নিজেদের শিল্পকর্ম দেখাত। ছবিগুলো দেখে কোনও বিরূপ মন্তব্য করা বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে কখনও দেখিনি।



গত দশ বছরে খুব কাছ থেকে যোগেনদার মধ্যে একজন সুভদ্র, সংবেদনশীল মনের মানুষকে আবিষ্কার করেছি। নীরবে কত মানুষের পাশে যে দাঁড়িয়েছেন, সেটা কাছে না গেলে বুঝতেই পারতাম না।
ওঁর ব্যক্তিগত জীবন বা ওঁর রাজনৈতিক মতবাদ নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ বা মাথাব্যথা নেই। আমি নিজে যে মানুষকে যেভাবে পাই, সেই মতোই বিশ্লেষণ করি তাঁকে। দিন যত যাচ্ছিল, আমার এবং আমার কন্যার প্রতি ওঁর স্নেহ এবং প্রশ্রয় ততই বাড়ছিল। যোগেনদার কাছে আমাদের অবারিত দ্বার ছিল। আমাদের এবং যোগেনদার রবীন্দ্রনুরাগ সম্ভবত আমাদের একসূত্রে গেঁথেছিল।



অসম্ভব গুণগ্রাহী মানুষ ছিলেন। ওঁরই পরিচিত শিল্পী সুব্রত ঘোষের লেখা, ‘অবন-গগন’ বইটির প্রকাশ অনুষ্ঠান নিয়ে আমাকে নানা নির্দেশ দিয়েছিলেন। ভীষণ ভালবাসতেন রবীন্দ্রসংগীত। পছন্দের শিল্পী তালিকায় ছিলেন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, চিত্রলেখা চৌধুরী, সুবিনয় রায় প্রমুখ। শাস্ত্রীয় সংগীতে উনি খুব ভালবাসতেন পণ্ডিত মল্লিকার্জুন মনসুরের গান। বছর দুয়েক আগে রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার, গোলপার্কে বাংলাদেশের শিল্পী অদিতি মহসিনের গান শুনতে যোগেনদা আমার সঙ্গে যান। আমরা দুজনেই সেই অনুষ্ঠান খুব উপভোগ করি।
বর্তমান সময়ে রঞ্জিনী মুখোপাধ্যায়ের গান ছিল তাঁর অত্যন্ত প্ৰিয়। তাঁর পৌত্রীসম আমার কন্যা সুপ্রীতার গান ভালবাসতেন, ওঁকে ভীষণ উৎসাহ দিতেন। চাইতেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং রবীন্দ্রসদন আয়োজিত রবীন্দ্রজন্মোৎসবের এক পক্ষকাল অনুষ্ঠানে সুপ্রীতা যেন সুযোগ পায়।

একবার আমায় বললেন, ‘তুমি ওর গান একটা পেন ড্রাইভে তুলে আমাকে দাও, সঙ্গে একটা সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিও, আমি মমতাকে অনুরোধ করব, তারপর ও যদি সুযোগ না পায়, তাহলে আমি রাজ্য চারুকলার পদ ছেড়ে দেব।’
আমাদের প্রতি যোগেনদার এ হেন স্নেহ অনেকের ঈর্ষার কারণ হয়ে উঠল। উনি যাঁদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে থাকতেন, তাঁদের অনেকে আমার বিরুদ্ধে হুইস্পার ক্যাম্পেইন করতে শুরু করল। কলকাতার একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক দম্পতি, যাঁরা এক সময় আমার পরিবারের অত্যন্ত নিকটজন ছিল, তাঁরাও নানাজনের কাছে যোগেনদার সঙ্গে আমার নাম জড়িয়ে নানান বিরূপ মন্তব্য করতে লাগলেন।



অবশ্য তাতে চিঁড়ে ভিজল না। যোগেনদা নির্বিকার, উনি যখনই মনে করেছেন, তখনই আমাকে ডেকে পাঠিয়ে বা ফোন করে কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন। স্নেহবশত অনেক ছবিও এঁকে দিয়েছেন, পরে বুঝেছি সেটাও আমার তথাকথিত শুভনুধ্যায়ীদের গাত্রদাহের অন্যতম কারণ।
রোজ সন্ধ্যেয় চারুবাসনায় এসে চা খেয়ে গল্প না করলে ওঁর ভাত হজম হত না। ১০টা বেজে গেলে আরও এক প্রস্থ চা খাওয়ার প্রস্তাব দিতেন সবাইকে। আসলে চাইতেন, আরও কিছুক্ষণ আড্ডা দিতে।
রাষ্ট্রপতি ভবনে উনি কিউরেটর থাকার সময় যে কজন রাষ্ট্রপতিকে দেখেছেন, তাঁদের সম্পর্কে নানান মজার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতেন। শ্রীমতি গান্ধীর কথাও খুব বলতেন। রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে সাক্ষাতের গল্প শুনেছিলাম।
বছর দুয়েক আগে চিত্রশিল্পী সমীর আইচের বাড়িতে যোগেনদার নিমন্ত্রণ, আমাকে ফোন করে বললেন, ‘একা যেতে ভাল লাগছে না, তুমিও চল।’ আমি একটু কিন্তু কিন্তু করছিলাম। তারপরে বললাম, ‘সমীরদার বাড়িতে যাওয়ার ব্যাপারে আমার খুব একটা লজ্জা পাওয়া উচিত নয়, কারণ সংবাদপত্রের কাজে বহু বছর ধরে সমীরদার বাড়িতে গিয়েছি। উনি যথেষ্ট স্নেহ করেন।’
সেখানে গিয়ে যোগেনদা বললেন এক থালাতেই খাবার দিতে। বলেছিলেন, ‘আমি আর অরিজিৎ শেয়ার করে খাব। এখন ভাবতে অবাক লাগে, যোগেনদার মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন চিত্রশিল্পীকে কত সহজে আপনজন হিসেবে পেয়েছিলাম।



আরও একটা আড্ডা জমে উঠত ওঁর সাউথ সিটির ফ্ল্যাটে। মাসে একবার বা দু’বার সকালের দিকে যেতাম। তখন কফি-যোগে আড্ডা একেকদিন দুপুর পর্যন্ত গড়িয়ে যেত। কফি খাওয়ার বিষয়টা এক কাপে সীমাবদ্ধ থাকত না। যোগেনদাই বলতেন, ‘তুমি কি আরেক কাপ খাবে?’ বৌদি মজা করে বলতেন তুমি খেলে, তোমার যোগেনদাও আর এক কাপ খাওয়ার সুযোগ পাবে। কতরকম গল্প হত!
রাষ্ট্রপতি ভবনে উনি কিউরেটর থাকার সময় যে কজন রাষ্ট্রপতিকে দেখেছেন, তাঁদের সম্পর্কে নানান মজার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতেন। শ্রীমতি গান্ধীর কথাও খুব বলতেন। রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে সাক্ষাতের গল্প শুনেছিলাম।



চারুবাসনায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করতে গিয়ে তিনবার তিনজন বিশিষ্ট মানুষকে নিয়ে আসতে পেরেছিলাম। একবার শর্মিলা ঠাকুর, আরেকবার পণ্ডিত বিশ্বমোহন ভাট আর দু’বছর আগে অমল পালেকরকে। যোগেনদা খুব খুশি হয়েছিলেন।
করোনাকালে যখন সৌমিত্রকাকু (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) এবং প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের জীবনাবসান হল, তখন সংবাদপত্রের বিশেষ প্রতিবেদনের জন্য ফোনে যোগেনদার বক্তব্য জানতে চাইলে বললেন, ‘রাত ১২টা নাগাদ ফোন কোরো।’ তাই করলাম। দু’জনকে নিয়ে ওঁর স্মৃতির কথা শোনালেন, কিন্তু যোগেনদাকে নিয়ে যে এত তাড়াতাড়ি স্মৃতিচারণ করতে হবে ভাবিনি! হয়তো সঠিক সময়ই সব কিছু ঘটেছে, কিন্তু আপনজনদের বিয়োগ মেনে নিতে কষ্ট হয়। মনে হয় আরও কিছুদিন থাকলে কী এমন ক্ষতি হত!
পুরোনো কথা মনে করার জন্য যতই স্মৃতির ভিতর বিচরণ করছি, ততই আরও বহু এলোমেলো কথা মনে আসছে! সব লিখতে গেলে হয়তো একটা গোটা বই হয়ে যাবে, আর এই লেখাও দীর্ঘায়িত হবে। আবার সব কথা লেখাও সমীচীন নয়।
পুরোনো কথা মনে করার জন্য যতই স্মৃতির ভিতর বিচরণ করছি, ততই আরও বহু এলোমেলো কথা মনে আসছে! সব লিখতে গেলে হয়তো একটা গোটা বই হয়ে যাবে, আর এই লেখাও দীর্ঘায়িত হবে। আবার সব কথা লেখাও সমীচীন নয়।
এই লেখায় শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণই করলাম, কারণ ওঁর ছবির জগৎ নিয়ে কিছু বলাটা ধৃষ্টতা হবে, আর আমি চিত্রশিল্পের মানুষও নই। যোগেনদা আমার অভিভাবক না বন্ধু, সেটাই বুঝে উঠতে পারিনি আজ পর্যন্ত! কোথাও তো থামতে হবে। ঠিক চার মাস আগে বর্ষার এক বিষণ্ণ বিকেলে হারিয়েছিলাম মাকে আর আজ হেমন্তের এক বিষণ্ণ সন্ধ্যায় যোগেনদার নিথর শরীরের সামনে দাঁড়িয়ে গাইলাম, ‘তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি ধাই।’ মনে হল, আমাদের গানের উত্তরে যোগেনদা বলে গেলেন, ‘আমার যাওয়া তো নয় যাওয়া।’
ছবি সৌজন্য: লেখক
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
